জাতীয়তার ভিত্তিতে কোনো ধরনের বৈষম্য ইউরোপীয় চুক্তির পরিপন্থী বলে সতর্ক করেছে ইউরোপীয় কমিশন; বিপরীতে এটি ভাষাগত সমস্যা দূরীকরণের উদ্যোগ দাবি করে অধ্যাদেশ বাস্তবায়নে অনড় অবস্থান প্রকাশ করেছে মেলোনি প্রশাসন।
ইতালির শ্রেণিকক্ষগুলোতে বিদেশি শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ সংখ্যা বা কোটা নির্ধারণের সরকারি উদ্যোগকে কেন্দ্র করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং ইতালি সরকারের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাহী শাখা ইউরোপীয় কমিশন সাফ জানিয়ে দিয়েছে, জাতীয়তার ভিত্তিতে কোনো শিক্ষার্থীকে সীমাবদ্ধ করা সরাসরি ইউরোপীয় জোটের নীতিমালার স্পষ্ট লঙ্ঘন। তবে ব্রাসেলসের এই সতর্কবার্তাকে তোয়াক্কা না করে সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশ বাস্তবায়নে সরকার এগিয়ে যাবে বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন ইতালির শিক্ষামন্ত্রী জুসেপ্পে ভালদিতারা।
ইউরোপীয় কমিশন তাদের আনুষ্ঠানিক অবস্থানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের মৌলিক চুক্তি অনুযায়ী নাগরিকত্ব বা জাতীয়তার ভিত্তিতে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ যেকোনো রূপের বৈষম্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ইউরোপীয় আইনে একমাত্র জনশৃঙ্খলা, জননিরাপত্তা অথবা জনস্বাস্থ্যের মতো বিশেষ জরুরি ব্যতিক্রম ছাড়া এমন কোনো বৈষম্যমূলক পদক্ষেপের কোনো আইনি বৈধতা নেই। কমিশনের এই কড়া বার্তার জবাবে ইতালির শিক্ষা ও মেধা বিষয়ক মন্ত্রী জুসেপ্পে ভালদিতারা বলেন, “এখানে কোনো সমস্যারই অস্তিত্ব নেই এবং সরকার বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে তার সিদ্ধান্তে এগিয়ে যাবে।” তিনি যুক্তি দেখান যে, শিক্ষা খাতটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিরঙ্কুশ এখতিয়ারভুক্ত কোনো বিষয় নয়। পাশাপাশি তিনি দাবি করেন, এই আইনের উদ্দেশ্য কোনো বৈষম্য তৈরি করা নয়, বরং যেসব বিদেশি শিক্ষার্থী স্থানীয় ভাষা জানে না তাদের মূলধারায় খাপ খাইয়ে নিতে সহায়তা করা। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ইউরোপের বহু দেশে সদ্য আসা বিদেশি শিক্ষার্থীদের শুরুতে আলাদা শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের রীতি প্রচলিত রয়েছে।

শিক্ষামন্ত্রীর রাজনৈতিক দল লিগার সিনেটর রবার্তো মার্তি সরকারের এই অবস্থানকে সমর্থন করে জানান, এই অধ্যাদেশের লক্ষ্য জাতীয়তা বা নাগরিকত্বে আঘাত করা নয়, বরং শিক্ষার্থীদের ভাষাগত দক্ষতার উন্নয়ন ঘটানো। তবে দেশটির মূল বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টি (পিডি) এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিকে অধ্যাদেশটি প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে। পিডির প্রতিনিধি দলের প্রধান নিকোলা জিংগারেত্তি মন্তব্য করেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন চাপ প্রয়োগ করার আগেই সরকারের উচিত এটি বাতিল করা। কারণ এই সিদ্ধান্ত কেবল ইউরোপীয় চুক্তির পরিপন্থীই নয়, বরং তা সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান এবং ইতালির স্কুলগুলোর বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গেও সম্পূর্ণ অসঙ্গতিপূর্ণ।
সরকারি এই উদ্যোগের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইতালির বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান ও শিক্ষক সংগঠনগুলো। ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব স্কুল প্রিন্সিপালসের (দিরিজেন্তিস্কুওলা) জাতীয় সভাপতি আত্তিলিও ফ্রাত্তা বলেন, ব্রাসেলসের এই অবস্থান তাদের দীর্ঘদিনের উদ্বেগেরই প্রতিফলন। তিনি উল্লেখ করেন, স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনা করে কীভাবে উপযুক্ত শ্রেণিকক্ষ গঠন করতে হবে তা প্রধান শিক্ষকেরা ভালোভাবেই জানেন। সরকারের এমন পদক্ষেপ মূলত বিদ্যালয়গুলোর প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসনকে ক্ষুণ্ন করে এবং শিক্ষকদের ওপর নীতিপ্রণেতাদের অনাস্থার প্রকাশ ঘটায়।
এদিকে দেশটির শীর্ষ শিক্ষক ইউনিয়নগুলোর পক্ষ থেকেও ইউরোপীয় কমিশনের বক্তব্যকে পূর্ণ সমর্থন দেওয়া হয়েছে। শ্রমিক ইউনিয়ন সিজিআইএল-এর শিক্ষা শাখা এফএলসি-র সাধারণ সম্পাদক জান্না ফ্রাকাসি বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই অবস্থান মূলত ইতালির সংবিধানের গণতান্ত্রিক চেতনাকেই সমর্থন করেছে। অন্যদিকে জাতীয় শিক্ষক সমিতি ‘আনিয়েফ’ (ANIEF)-এর সভাপতি মার্সেলো পাসিফিকো মনে করেন, কমিশনের এই বক্তব্যকে প্রতিটি শিক্ষার্থীর শিক্ষার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার তাগিদ হিসেবে দেখা উচিত। তিনি জোর দিয়ে বলেন, শ্রেণিকক্ষে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা সীমিত না করে বরং বিদেশি শিশুদের ইতালি ভাষা শেখানোর জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগ দেওয়াই বর্তমান সংকটের একমাত্র সমাধান।
ইতালির স্কুলে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা সীমিত করার সরকারি পরিকল্পনা নিয়ে ইউরোপীয় কমিশনের আপত্তি; জাতীয়তার ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ উল্লেখ করলেও শিক্ষামন্ত্রী ভালদিতারা সিদ্ধান্তে অনড়।
ansa


