স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পিয়ান্তেদোসির নতুন নির্দেশনায় অভিবাসী বন্দিশিবিরে (CPR) প্রবেশের ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের ‘আটকের অনুপযুক্ততা’ সনদ দেওয়ার ক্ষমতা রদ করা হয়েছে; সুপ্রিম কোর্টের রায় ও জাতীয় আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক দাবি করে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
ইতালিতে অনিয়মিত অভিবাসীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর পূর্ব পর্যন্ত আটকে রাখার জন্য ব্যবহৃত প্রত্যাবাসন বন্দিশিবিরগুলোতে (CPR – Centri di permanenza per il rimpatrio) প্রবেশের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যগত ছাড়পত্রের দীর্ঘদিনের বাধ্যবাধকতা বাতিল করেছে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গত ৩ নভেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাত্তেও পিয়ান্তেদোসি স্বাক্ষরিত এক নতুন নির্দেশনায় ২০২২ সালের পূর্ববর্তী নীতির ৩ নম্বর অনুচ্ছেদে এই বড় পরিবর্তন আনা হয়। আগের বিধিমালার আওতায় কোনো অভিবাসীর শারীরিক বা মানসিক দুর্বলতা যদি সীমিত পরিসরের বন্দিশিবিরে অবস্থানের অনুপযোগী হতো, তবে চিকিৎসকের সেই সনদের ভিত্তিতে তাকে সেখানে আটক রাখা যেত না। তবে প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকার চিকিৎসকদের সেই ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা পুরোপুরি বিলুপ্ত করেছে।
নতুন নীতিমালার ফলে বন্দিশিবিরে নেওয়ার আগে কোনো ব্যক্তির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো হলেও, তিনি সেখানে থাকার উপযুক্ত কি না তা নির্ধারণ করার ক্ষমতা চিকিৎসকের থাকবে না। বরং সেই স্বাস্থ্য পরীক্ষার মূল কাজ হবে বন্দীর কোনো চিকিৎসা বা শারীরিক সহায়তা লাগবে কি না তা শনাক্ত করা, যা শিবিরের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ কিংবা স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ (ASL) সরবরাহ করবে। এমনকি কেন্দ্রের অভ্যন্তরীণ চিকিৎসকেরাও আর কোনো বন্দীকে কাঠামোগতভাবে ‘অনুপযুক্ত’ ঘোষণা করতে পারবেন না; কেবল বন্দীর অসুস্থতা ভেতরে সামাল দেওয়া অসম্ভব হলে তা কর্তৃপক্ষকে অবহিত করবেন। মূলত রাভেনা আদালতের তদন্তে ভুয়া চিকিৎসা সনদ দেখিয়ে কিছু অনিয়মিত অভিবাসীর আটকাদেশ ঠেকানোর অভিযোগ প্রকাশের পরই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই কঠোর অবস্থান নিল।

সরকারি এই নির্দেশনায় দেশটির চিকিৎসক মহলে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। ইতালির চিকিৎসকদের জাতীয় ফেডারেশন ফ্নোমসো (FNOMCEO)-র সভাপতি ফিলিপ্পো আনেল্লি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, চিকিৎসকেরা সরকারের নিরাপত্তা নীতির সহায়তাকারী কোনো প্রশাসনিক কর্মকর্তা নন। বরং স্বাস্থ্য ও মানবিক মর্যাদা সুরক্ষায় আটকাদেশের পরিবেশ কোনো ব্যক্তির ক্ষতির কারণ হলে তা প্রত্যয়ন করা চিকিৎসকের স্বাধীন পেশাগত দায়িত্ব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-ও নিশ্চিত করেছে যে অভিবাসীদের দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক আটক স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এবং তা মানসিক ব্যাধি সৃষ্টি করতে পারে। তদুপরি ইতালির বিভিন্ন বন্দিশিবিরে পূর্বেও মানবাধিকার লঙ্ঘন, অপ্রয়োজনীয় মানসিক ওষুধের ব্যবহার, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, অনাহার ধর্মঘট ও বন্দীদের মৃত্যুর বহু নথিভুক্ত তথ্য রয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্ত ইতালির বিদ্যমান আইন ও বিচারব্যবস্থার সঙ্গে এক মারাত্মক সংঘাত তৈরি করবে। ২০১৫ সালের ১৪২ নম্বর আইনি ডিক্রির ৭ নম্বর ধারার ৫ উপধারা অনুযায়ী, স্বাস্থ্যগতভাবে সংবেদনশীল কোনো ব্যক্তিকে আটকে রাখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, যা এখনও বহাল রয়েছে। এ ছাড়া ২০১৭ সালে ইতালির সুপ্রিম কোর্ট বা ক্যাসেশন আদালতের (Corte di Cassazione) এক ঐতিহাসিক আদেশে বলা হয়েছিল, যেকোনো আটকাদেশ বৈধ হতে হলে বন্দীর স্বাস্থ্যগত উপযুক্ততা যাচাই করা একটি ‘অপরিহার্য পূর্বশর্ত’। বিদ্যমান জাতীয় আইন ও সর্বোচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট নজির উপেক্ষা করে মন্ত্রণালয়ের এই প্রশাসনিক পরিপত্র কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, তা নিয়ে দেশটিতে নতুন এক আইনি অচলাবস্থার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইতালির নতুন নির্দেশনায় সিপিআর কেন্দ্রে অভিবাসীদের আটকের আগে স্বাস্থ্যগত অনুপযুক্ততা যাচাইয়ের বাধ্যতামূলক সনদ বাদ দেওয়া হয়েছে, যা চিকিৎসকদের স্বাধীনতা, মানবাধিকার ও বিদ্যমান আইনি সুরক্ষা নিয়ে বিতর্ক তৈরি করেছে।
repubblica


