ইউরোপজুড়ে ২৫টিরও বেশি ফ্লাইটে ভুয়া বোমা আতঙ্ক: তদন্তের মুখে রোমগামী বিমানের আইরিশ পাইলট

4 Min Read

রোম ও মিলানসহ ইউরোপের ব্যস্ততম আকাশসীমায় উড়োজাহাজে ধারাবাহিক বোমা হুমকির জেরে যুদ্ধবিমান মোতায়েন ও জরুরি অবতরণের ঘটনা ঘটেছে; সমন্বিত সাইবার হামলার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক তদন্ত শুরু করেছেন গোয়েন্দারা।

 কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ইউরোপের আকাশসীমায় ২৫টিরও বেশি বাণিজ্যিক উড়োজাহাজে বোমা থাকার হুমকি দেওয়া হয়েছে। আকস্মিক এই ঘটনায় মহাদেশটির বিমান যোগাযোগব্যবস্থায় ব্যাপক বিশৃঙ্খলা ও চরম আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। হুমকি পাওয়া ফ্লাইটগুলোর মধ্যে অন্তত ১০টি ইতালির রোম ও মিলান শহর থেকে উড্ডয়ন করেছিল কিংবা সেখানে অবতরণের কথা ছিল। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বেশ কয়েকটি ফ্লাইটকে জরুরি অবতরণ করাতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বিমানবাহিনী যুদ্ধবিমান পাঠিয়ে আকাশে পাহারা দেয়। তল্লাশি শেষে প্রতিটি হুমকিই ভুয়া বলে প্রমাণিত হলেও আন্তর্জাতিক আকাশপথে তা মারাত্মক বিঘ্ন তৈরি করে।

তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এয়ারলাইন্স ও বিমানবন্দর পরিচালনাকারী সংস্থাগুলোর কাছে পাঠানো বেনামি ইমেলের মাধ্যমে এই আতঙ্ক ছড়ানো হয়েছিল। ইতালির রোম ফিউমিচিনো বিমানবন্দরের পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ আদরের (ADR) ঠিকানায় ইতালীয় ভাষায় একটি বার্তা পাঠানো হয়। ‘হুমকির সংকেত’ শিরোনামের ওই ইমেলটি ‘কমবাত্তেন্তি দেল্লো স্তাতো মাস্কিলে’ (Combattenti dello Stato Maschile) নামের একটি অজ্ঞাত পরিচয় গোষ্ঠীর নামে পাঠানো হয়েছিল। বার্তাগুলো শনাক্তকরণ এড়াতে প্রোটন মেইলের মতো সংকেতায়িত ও পরিচয় গোপনকারী সেবা অথবা হ্যাক হওয়া ইমেল ঠিকানা ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া পেসকারা থেকে বেলজিয়ামের শার্লরোয়াগামী একটি রায়ানএয়ার বিমানের শৌচাগারে হাতে লেখা ‘বোমা’ শব্দ পাওয়ার পর কুকুর ও বিশেষজ্ঞ দল দিয়ে তল্লাশি চালানো হয়।

হুমকির জেরে সবচেয়ে নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় ডাবলিন থেকে ১৫১ জন যাত্রী নিয়ে রোমগামী এয়ার লিঙ্গাসের একটি এয়ারবাস এ৩২০ (Airbus A320) বিমানে। ফরাসি বিমানবাহিনীর রাফাল যুদ্ধবিমান সেটিকে ফ্রান্সের এভরো সামরিক ঘাঁটিতে অবতরণের নির্দেশ দেয়। তবে বিমানের আইরিশ পাইলট সামরিক ঘাঁটির বদলে বেসামরিক বিমানবন্দরে নামার আগ্রহ প্রকাশ করে শুরুতে নির্দেশ অমান্য করেন বলে অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে দুটি যুদ্ধবিমান পাঠিয়ে বিমানটিকে অবতরণে বাধ্য করা হয়। ওই পাইলটের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু করেছেন ফরাসি কৌঁসুলি রেমি কৌতিন। যাত্রীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিলেও পাইলটকে নিয়ম ভঙ্গের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

এই ভুয়া হুমকির কবলে পড়ে রায়ানএয়ার, উইজ এয়ার, ফিনএয়ার, এজিয়ান এয়ারলাইন্স ও এলওটি পোলিশ এয়ারলাইন্সের মতো শীর্ষ বিমান সংস্থাগুলো। মিলান মালপেনসা থেকে ওয়ারশগামী উইজ এয়ারের একটি ফ্লাইট ঘুরিয়ে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় জরুরি অবতরণ করানো হয়। অন্যদিকে হেলসিঙ্কি থেকে রোমগামী ফিনএয়ারের ফ্লাইটটি ইতালীয় যুদ্ধবিমানের পাহারায় রোমে অবতরণের পর পুলিশের বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল (Artificieri) পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালায়। এ ছাড়া লন্ডন, মাদ্রিদ, প্রাগ, ব্রাসেলস ও বুখারেস্টগামী একাধিক ফ্লাইটে ব্যাপক সময়ক্ষেপণ ও পথ পরিবর্তনের ঘটনা ঘটে।

ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখন খতিয়ে দেখছে যে এই হামলার পেছনে কোনো সমন্বিত আন্তর্জাতিক চক্র সক্রিয় রয়েছে কি না। এয়ার ফ্রান্স-কেএলএমের প্রধান নির্বাহী বেন স্মিথ জানান, এত বড় পরিসরে সুসংগঠিত হুমকি অতীতে কখনো দেখা যায়নি। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিবহন কমিশনার অ্যাপোস্তোলোস তজিৎজিকোস্তাস সংযত মন্তব্য করে বলেছেন, ঘটনাগুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত কি না তা নিশ্চিত হতে আরও প্রমাণের প্রয়োজন রয়েছে।

ইতালির সীমান্ত পুলিশ পোলারিয়া (Polaria) ও সাইবার অপরাধ দমন বিভাগ পলিজিয়া পোস্তালে (Polizia Postale) ধারণা করছে, দিনকয়েক আগে দেশটির প্রায় ২৮০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কয়েকটি বিমানে পাঠানো বার্তার সঙ্গে এই ঘটনার যোগসূত্র থাকতে পারে। ইউরোপীয় বিমান নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ইউরোকন্ট্রোলের হিসাবে দিনে নির্ধারিত প্রায় সাড়ে ২৭ হাজার ফ্লাইটের তুলনায় এই সংখ্যা কম হলেও যাত্রী ও প্রবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে এটি বড় ধরনের ভ্রমণ ভোগান্তি তৈরি করেছে।


কয়েক ঘণ্টায় ইউরোপজুড়ে ২৫টির বেশি ভুয়া বোমা হামলার সতর্কতা, যার ১০টি রোম ও মিলানগামী ফ্লাইটে; বিমান ঘুরিয়ে দেওয়া ও যুদ্ধবিমান দিয়ে পাহারার ঘটনায় সমন্বিত ষড়যন্ত্রের সন্দেহে তদন্ত চলছে।

ilfattoquotidiano

Share This Article