ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালির ল্যাম্পেডুসা যাওয়ার পথে তিউনিসিয়া উপকূলে নৌকাডুবিতে অন্তত ১২ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এই মর্মান্তিক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দেশটির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর বেন গুর্দেনে তীব্র বিক্ষোভ ও অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে।
মূল ঘটনা ও উদ্ধার অভিযান
তিউনিসিয়ার ন্যাশনাল গার্ডের দেওয়া তথ্যমতে, গত শুক্রবার রাতে জারজিস উপকূল থেকে প্রায় ১৪ নটিক্যাল মাইল দূরে ১৫ জন আরোহী নিয়ে একটি ছোট নৌকা উল্টে যায়। ধারণা করা হচ্ছে, আরোহীদের গন্তব্য ছিল ইতালি। সপ্তাহজুড়ে চলা উদ্ধার অভিযানে এ পর্যন্ত ১২টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজ বাকি দুই ব্যক্তির সন্ধানে এখনো সাগরে তল্লাশি চালাচ্ছে ন্যাশনাল গার্ড, নৌবাহিনী এবং সিভিল প্রোটেকশন ইউনিট। উদ্ধার কাজে দুটি হেলিকপ্টারও নিয়োজিত করা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নৌকার আরোহীদের মধ্যে ১৪ জনই লিবিয়া সীমান্তবর্তী শহর বেন গুর্দেনের বাসিন্দা এবং একজন জারজিসের। উদ্ধার হওয়াদের মধ্যে একই পরিবারের সাত সদস্য এবং এক অন্তঃসত্ত্বা নারী ও তাঁর স্বামী রয়েছেন। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় মাত্র একজন ব্যক্তিকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। একটি বাণিজ্যিক জাহাজের মাধ্যমে উদ্ধার হওয়ার আগে ওই ব্যক্তি টানা ৪৮ ঘণ্টা উত্তাল সমুদ্রে ভেসে ছিলেন বলে স্থানীয় গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন।
বেন গুর্দেনে গণবিক্ষোভ
নৌকাডুবিতে তরুণদের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বেন গুর্দেনে শোকের ছায়া নেমে আসে, যা দ্রুত ক্ষোভে রূপান্তরিত হয়। ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা উদ্ধার অভিযানে ধীরগতির অভিযোগ তুলে শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা অবরোধ করেন এবং টায়ার জ্বালিয়ে প্রতিবাদ জানান। বিক্ষোভকারীদের দাবি, নিখোঁজদের উদ্ধারে প্রশাসনকে আরও তৎপর হতে হবে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে নিরাপত্তা বাহিনীকে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করতে হয়েছে বলে জানা গেছে।
এই বিক্ষোভের নেপথ্যে রয়েছে ওই অঞ্চলের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অর্থনৈতিক ক্ষোভ। তিউনিসিয়ার সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলটি ঐতিহাসিকভাবে অবহেলিত। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটিতে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার বর্তমানে ৩৫ শতাংশ। কর্মসংস্থানের অভাব এবং উন্নত জীবনের আশায় এই অঞ্চলের যুবসমাজ জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রপথে ইউরোপে পাড়ি দেওয়ার পথ বেছে নিচ্ছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিতর্কিত চুক্তি ও মানবাধিকার উদ্বেগ
অভিবাসন সংকট মোকাবিলায় ২০২৩ সালে তিউনিসিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে ২৫৫ মিলিয়ন ইউরোর একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। ইতালির সরকারের জোরালো সমর্থনে হওয়া এই চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল তিউনিসিয়া উপকূলে কড়া নজরদারি চালানো এবং নৌকার যাত্রা বন্ধ করা। তবে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো ৪৬টি মানবাধিকার সংস্থা এই চুক্তির কড়া সমালোচনা করেছে। তাদের অভিযোগ, এই চুক্তির ফলে অভিবাসীদের ওপর পদ্ধতিগত নিপীড়ন বেড়েছে। জাতিসংঘ সতর্ক করেছে যে, তিউনিসিয়া ও লিবীয় সীমান্তে হাজার হাজার অভিবাসী এবং রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীকে বেআইনিভাবে আটক, গণ-বহিষ্কার এবং পাচারের শিকার হতে হচ্ছে।
ভূমধ্যসাগরে ক্রমবর্ধমান মৃত্যু
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (IOM)-এর মতে, সেন্ট্রাল মেডিটেরানিয়ান বা মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় রুট বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক অভিবাসন পথ। সংস্থাটি জানিয়েছে, চলতি ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই এই রুটে প্রাণহানির সংখ্যা গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। আইওএম-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ বছর এখন পর্যন্ত অন্তত ৯১৪ জন অভিবাসী এই পথে সমুদ্র পাড়ি দিতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন অথবা নিখোঁজ হয়েছেন। তিউনিসিয়ার এই সাম্প্রতিক ট্র্যাজেডি আবারও প্রমাণ করল যে, কঠোর সীমান্ত নীতি সত্ত্বেও জীবন বাঁচাতে মানুষের বিপজ্জনক সাগর পাড়ি দেওয়ার প্রবণতা কমছে না।
নিহতদের মরদেহগুলো ইতিমধ্যে আইনি প্রক্রিয়া শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা হয়েছে। নিখোঁজ দুই ব্যক্তির সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত তল্লাশি অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে তিউনিসিয়ার জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা।
২০২৬ সালে মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় অভিবাসনপথে এ পর্যন্ত অন্তত ৯১৪ জন অভিবাসী নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন, যা বিশ্বে সবচেয়ে প্রাণঘাতী অনিয়মিত অভিবাসনপথগুলোর ভয়াবহতা তুলে ধরে।
infomigrants


