ইতালির রাজধানী রোমে একটি ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় এক বাংলাদেশি যুবক ও এক ইতালীয় নাগরিক গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন। অন্যদিকে, ২০১৬ সালে মধ্য ইতালিতে আঘাত হানা বিধ্বংসী ভূমিকম্পের ১০ বছর পূর্ণ হওয়ার স্মরণে দেশজুড়ে আবেগঘন পরিবেশ বিরাজ করছে। প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করে পুনর্গঠন কাজ দ্রুত শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
রোমে সড়ক দুর্ঘটনা ও বাংলাদেশির অবস্থা
গত ২২ আগস্ট বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা আনুমানিক সাড়ে ৬টার দিকে রোমের করসো ত্রিয়েস্তে (Corso Trieste) এলাকায় এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। পিয়াজ্জা আনিবালিয়ানো (Piazza Annibaliano) পার হয়ে ১৭৫ নম্বর সড়কের সামনে একটি টয়োটা ইয়্যারিস গাড়ি হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশে থাকা একটি পেট্রোল পাম্প বা গ্যাস স্টেশনের ওপর উঠে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, গাড়িটি যখন নিয়ন্ত্রণ হারায় তখন সেটি ভায়া নোমেনতানা (via Nomentana) অভিমুখে যাচ্ছিল।
গাড়িটি সরাসরি সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা দুই ব্যক্তিকে প্রচণ্ড বেগে ধাক্কা দেয়। আহতদের মধ্যে একজন ২৮ বছর বয়সী বাংলাদেশি নাগরিক এবং অন্যজন ৪৮ বছর বয়সী এক ইতালীয় পুরুষ। সংঘর্ষের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, দুজনই মারাত্মকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হন। ঘটনার পরপরই জরুরি বিভাগের ১১৮ ইউনিটের কর্মীরা সেখানে পৌঁছান এবং উভয়কেই ‘কোড রেড’ বা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করেন। ৪৮ বছর বয়সী ইতালীয় নাগরিককে দ্রুত পলিক্লিনিকো উমবার্তো ১ (Policlinico Umberto I) এবং ২৮ বছর বয়সী বাংলাদেশি যুবককে সান জিওভান্নি (San Giovanni) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বর্তমানে তারা চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন।
গাড়িটি চালাচ্ছিলেন ৩০ বছর বয়সী এক ইতালীয় নারী। দুর্ঘটনার পর তিনি ঘটনাস্থলেই অবস্থান করেন। যদিও তিনি শারীরিকভাবে অক্ষত ছিলেন, তবে মানসিকভাবে অত্যন্ত বিপর্যস্ত বা শকে ছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। নিয়ম অনুযায়ী, তিনি মদ্যপ বা কোনো ধরনের মাদকাসক্ত অবস্থায় ছিলেন কি না তা নিশ্চিত করতে পুলিশ তার অ্যালকোহল ও টক্সিকোলজিক্যাল পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে। রোম পুলিশের ‘২য় গ্রুপ পারিওলি’ (II Gruppo Parioli) শাখার কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করেছেন।
ভূমিকম্পের ১০ বছর: আমাত্রিচে মেলোনির শ্রদ্ধা
এদিকে, পুরো ইতালি আজ স্মরণ করছে ২০১৬ সালের ২৪ আগস্টের সেই কালরাতকে। আজ থেকে ১০ বছর আগে ভোর ৩টা ৩৬ মিনিটে ৩৯৯ জন মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়া সেই ভয়াবহ ভূমিকম্পের স্মৃতি নিয়ে শোকাতুর দেশবাসী। প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল আমাত্রিচে (Amatrice) বিশেষ স্মারক অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে নিহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে স্বীকার করেন যে, দীর্ঘ ১০ বছরেও পুনর্গঠনের কাজ প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি। তবে তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে, তার সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকারি ও বেসরকারি পুনর্গঠন প্রকল্পে নতুন করে গতি সঞ্চার করেছে। ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম প্রতীক নর্সিয়ার (Norcia) সেন্ট বেনেডিক্ট ব্যাসিলিকার মতো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া স্থাপনাগুলো পুনরায় সংস্কার করা হয়েছে। মেলোনি বলেন, “আমাদের লক্ষ্য কেবল অবকাঠামো নির্মাণ নয়, বরং মধ্য অ্যাপেনাইন অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রাণচাঞ্চল্য ফিরিয়ে আনা।”
পরিদর্শনকালে এক আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যখন আমাত্রিচের এক বয়োজ্যেষ্ঠ বাসিন্দা প্রধানমন্ত্রীকে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি মেলোনির উপস্থিতি দেখে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে একে তার জীবনের ‘সবচেয়ে বড় আনন্দ’ হিসেবে অভিহিত করেন। প্রধানমন্ত্রীও তাকে সান্ত্বনা দেন এবং স্থানীয় জনগণের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেন।
গুরুত্ব ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
রোমে এই দুর্ঘটনা এবং ভূমিকম্পের বার্ষিকী—উভয় ঘটনাই ইতালিতে বসবাসরত বিদেশি ও স্থানীয় নাগরিকদের নিরাপত্তার প্রশ্নটিকে নতুন করে সামনে এনেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশি কমিউনিটির একজন সদস্য গুরুতর আহত হওয়ায় রোমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে উদ্বেগ কাজ করছে। অন্যদিকে, সরকারের পুনর্গঠন প্রকল্পের কার্যকারিতা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় ইতালির সক্ষমতা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা চলছে। উভয় ঘটনার তদন্ত ও পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপের দিকে সাধারণ মানুষের সজাগ দৃষ্টি রয়েছে।
১০ বছর পরও আমাত্রিচে ভূমিকম্পের ক্ষত স্মরণীয়; পুনর্গঠন ও সামাজিক-অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে ইতালির কাজ অব্যাহত, একই সঙ্গে বাস্তুচ্যুত জনপদকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্য জোরদার করা হয়েছে।
rainews


