ইতালির অভিবাসন মানচিত্রে বড় পরিবর্তন: বৈধভাবে আসার দৌড়ে একক দেশ হিসেবে শীর্ষে বাংলাদেশ

4 Min Read

ইতালির সামগ্রিক অভিবাসন ও জনতাত্ত্বিক কাঠামোতে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশটিতে প্রথাগতভাবে ইউরোপীয় দেশগুলো থেকে আগতদের সংখ্যা কমলেও এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে বৈধভাবে বসবাসের জন্য আসা মানুষের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে, ২০২৫ সালের নতুন নিবন্ধনের পরিসংখ্যানে একক দেশ হিসেবে সব দেশকে ছাড়িয়ে শীর্ষস্থান দখল করেছে বাংলাদেশ।

অভিবাসনের নতুন গতিপ্রকৃতি

গত তিন বছরের (২০২৩-২০২৫) তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ইতালি থেকে প্রবাসীদের বহির্গমন এবং নতুনদের আগমনের হিসাব শেষে নিট ৩ লাখ ২৮ হাজার নতুন বাসিন্দা দেশটিতে যুক্ত হয়েছেন। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশই এসেছেন দক্ষিণ এশিয়া এবং উত্তর আফ্রিকার দেশগুলো থেকে। ২০২৫ সালের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বাংলাদেশ এখন ইতালিতে বৈধ অভিবাসনের প্রধান উৎস দেশে পরিণত হয়েছে। এই এক বছরেই ৩৭ হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি নাগরিক ইতালিতে নতুন করে নিবন্ধিত হয়েছেন, যা ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় ৪৪.৩ শতাংশ বেশি।

বাংলাদেশের ঠিক পরেই অবস্থান করছে মরক্কো। গত দুই বছরে মরক্কো থেকে বৈধভাবে আসা মানুষের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৭১.৬ শতাংশ। এছাড়া এশিয়ার অন্যান্য দেশের মধ্যে শ্রীলঙ্কা থেকে আগতদের সংখ্যায় বিস্ময়কর উল্লম্ফন লক্ষ্য করা গেছে। গত তিন বছরে শ্রীলঙ্কানদের নতুন নিবন্ধনের হার বেড়েছে প্রায় ১৫৩.৬ শতাংশ। পাশাপাশি পাকিস্তান থেকে ২৫.৭ শতাংশ এবং ভারত থেকে প্রায় ২৩ শতাংশ বেশি মানুষ বৈধভাবে ইতালিতে প্রবেশ করেছেন।

ইউরোপ ও আমেরিকার নিম্নমুখী হার

এশিয়া ও আফ্রিকার এই জয়জয়কারের বিপরীতে ইউরোপীয় দেশগুলো থেকে ইতালিতে আসার হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। একই চিত্র দেখা গেছে আমেরিকা মহাদেশের দেশগুলোর ক্ষেত্রেও। গত তিন বছরে আমেরিকা থেকে অভিবাসনের হার সামগ্রিকভাবে ৭ শতাংশ কমেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের ক্ষেত্রে। আর্জেন্টিনা থেকে আসা নতুন বাসিন্দার সংখ্যা গত দুই বছরের তুলনায় ৫১.৩ শতাংশ কমেছে এবং ব্রাজিল থেকে কমেছে প্রায় ২৮ শতাংশ।

এই নিম্নমুখী প্রবণতার পেছনে ইতালীয় নাগরিকত্ব আইনের কঠোরতাকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। মূলত ‘ইউর সাঙ্গুইনিস’ (Iure Sanguinis) বা রক্তের উত্তরাধিকার সূত্রে ইতালীয় নাগরিকত্ব লাভের ক্ষেত্রে বিধিমালা সংশোধন ও কঠোর করার ফলে লাতিন আমেরিকায় বসবাসরত ইতালীয় বংশোদ্ভূতদের আগমনের পথ সীমিত হয়েছে।

পছন্দের শীর্ষে মিলান ও অন্যান্য শহর

নতুন করে আসা এই বিশাল জনগোষ্ঠীর পছন্দের গন্তব্য হিসেবে ইতালির বাণিজ্যিক রাজধানী মিলান এখনও তালিকার শীর্ষে। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে মিলানে নতুন বাসিন্দার হার ৩৩.৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে কেবল মিলান নয়, ইতালির উত্তরাঞ্চলীয় এবং মধ্যাঞ্চলীয় অন্যান্য শহরগুলোতেও অভিবাসীদের ভিড় বাড়ছে। পাভিয়া (Pavia), আলেসান্দ্রিয়া (Alessandria), ভেরচেল্লি (Vercelli) এবং আনকোনা (Ancona) শহরেও নতুন অভিবাসীদের সংখ্যা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেড়েছে বলে পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে।

গুরুত্ব ও ভবিষ্যৎ প্রভাব

ইতালির এই পরিবর্তিত অভিবাসন চিত্র দেশটির শ্রমবাজার এবং সামাজিক কাঠামোতে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশি অভিবাসীদের এই ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি ইতালির অর্থনীতিতে প্রবাসী আয় এবং স্থানীয় উৎপাদনশীলতায় বড় ভূমিকা রাখবে। তবে এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে আসা নতুন এই জনগোষ্ঠীর জন্য আবাসন, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সংহতি নিশ্চিত করা ইতালীয় প্রশাসনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। ইতালিতে বসবাসরত বিদেশি নাগরিকদের অধিকার এবং বৈধ পথ শক্তিশালী করার বিষয়টিও এখন নীতিনির্ধারকদের আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।

ইতালির বৈধ অভিবাসনের চিত্র বদলেছে—২০২৫ সালে ৩৭ হাজারের বেশি নতুন নিবন্ধন নিয়ে বাংলাদেশ শীর্ষ উৎসদেশ, যা ২০২৩ সালের তুলনায় ৪৪.৩% বেশি।

amp.tgcom24.mediaset

Share This Article