ইতালিতে বাংলাদেশি কর্মীদের অমানবিক শোষণের ঘটনায় দুই শীর্ষ ফ্যাশন ব্র্যান্ডে বিচারিক নজরদারি

3 Min Read

পোশাক সরবরাহ শৃঙ্খলে নজরদারির চরম অবহেলার দায়ে ‘প্যাট্রিসিয়া পেপে’ ও ‘ডিক্সি’র বিরুদ্ধে এক বছরের বিশেষ প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ জারি করেছে ফ্লোরেন্সের আদালত।

তৈরি পোশাক কারখানায় বাংলাদেশি, পাকিস্তানি ও আলবেনীয় অভিবাসী শ্রমিকদের অমানবিক পরিবেশে খাটানো এবং শ্রম শোষণের ঘটনায় পর্যাপ্ত নজরদারি না করায় ইতালির প্রখ্যাত দুই ফ্যাশন ব্র্যান্ডকে এক বছরের জন্য বিচারিক নিয়ন্ত্রণে (amministrazione giudiziaria) নেওয়া হয়েছে। ফ্লোরেন্সের বিশেষ প্রতিরোধ আদালতের আদেশে ‘প্যাট্রিসিয়া পেপে’ ব্র্যান্ডের মূল প্রতিষ্ঠান তেসিলফর্ম (Tessilform) এবং অপর জনপ্রিয় ব্র্যান্ড ‘ডিক্সি’ (Dixie)-র ওপর এই আদেশ জারি করা হয়। প্রাতো শহরের সরকারি কৌঁসুলি বা প্রসিকিউটর কার্যালয়ের আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত এই কঠোর নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন।

আদালত পর্যবেক্ষণে জানান, ব্র্যান্ড দুটি তাদের সাব-কন্ট্রাক্ট বা পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মপরিবেশ তদারকি করতে মারাত্মক ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলো অবৈধ শ্রমিক নিয়োগ, নামমাত্র পারিশ্রমিক এবং অতিরিক্ত কর্মঘণ্টায় শ্রমিকদের কাজ করতে বাধ্য করছিল। স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগ এবং দেশটির অর্থনৈতিক অপরাধ দমন পুলিশ ‘গুয়ার্দিয়া দি ফিনানজা’র (Guardia di Finanza) যৌথ তদন্তে জানা যায়, একটি আলবেনীয় দম্পতি মধ্যস্বত্বভোগী চক্রের মাধ্যমে মূলত প্রাতো এলাকার ‘রে-স্তিরো’ (Re-Stiro) ও ‘আলবা’ (Alba srl) নামের প্রতিষ্ঠান দিয়ে এসব শোষণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছিল।

শ্রম শোষণের এই চিত্র প্রকাশ্যে আসে যখন আলবা কারখানার সামনে কর্মপরিবেশের উন্নতির দাবিতে আয়োজিত এক শান্তিপূর্ণ সমাবেশে এক বাংলাদেশি শ্রমিকের ওপর বর্বর হামলা চালানো হয়। স্বাধীন শ্রমিক ইউনিয়ন ‘সুদ্দ কোবাস’ (Sudd Cobas)-এর নেতৃত্বে পরিচালিত ওই আন্দোলনের অংশ হিসেবে শ্রমিকরা পরবর্তীতে সুবিচারের দাবিতে ফ্লোরেন্সের ঐতিহাসিক ক্যাথেড্রাল স্কয়ারে (Piazza Duomo) অবস্থিত প্যাট্রিসিয়া পেপের মূল শোরুম কয়েক ঘণ্টার জন্য ঘেরাও করে রেখেছিলেন।

তদন্তকারী কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, ভুয়া ও নামসর্বস্ব কোম্পানির মাধ্যমে শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা ফাঁকি দিয়ে অভিযুক্ত আলবেনীয় চক্রটি অন্তত ৫ লাখ ইউরো অবৈধ মুনাফা অর্জন করেছে। এই আইনি প্রক্রিয়ায় প্রসিকিউটরদের সহযোগিতা করায় ভুক্তভোগী ১৮ জন অভিবাসী শ্রমিকের জন্য আইনি বিবেচনায় বিশেষ রেসিডেন্স পারমিট বা ‘পেরমেসো দি সোজোর্নো’ (permesso di soggiorno per motivi di giustizia) ইস্যুর আবেদন করা হয়েছে। অন্যদিকে প্রাতোর প্রধান কৌঁসুলি লুকা তেসকারোলি এক বিবৃতিতে জানান, এই অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা বিস্তৃত অপরাধ চক্র ও শ্রম শোষণ কার্যকরভাবে দমন করতে বিশেষায়িত তদন্তকারী পুলিশ ও প্রসিকিউশন বিভাগে জরুরিভিত্তিতে জনবল বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

এই পদক্ষেপের বিষয়ে ডিক্সি ব্র্যান্ডের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, তারা কোনো ধরনের বেআইনি শ্রম শোষণের সঙ্গে জড়িত নন এবং যৌথ সমাধানের জন্য আদালতের সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতা করবেন। অপরদিকে তেসিলফর্ম (প্যাট্রিসিয়া পেপে) এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানায়, আদালতের এই আদেশ কোনো শাস্তিমূলক রায় নয় বরং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। সরবরাহকারী যে তৃতীয় পক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তাদের সঙ্গে এক বছর আগেই সব ধরনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি নিশ্চিত করেছে যে, তাদের নিজস্ব পরিচালনা পর্ষদ বহাল রয়েছে এবং কারখানা ও কর্মীদের নিয়মিত কার্যক্রম স্বাভাবিক নিয়মেই চলবে।


শ্রমিক শোষণ ঠেকাতে যথাযথ নজরদারির ব্যর্থতায় ইতালিতে পাত্রিজিয়া পেপে ও ডিক্সি ফ্যাশন ব্র্যান্ডকে এক বছরের বিচারিক প্রশাসনের আওতায় আনার নির্দেশ দিয়েছে ফ্লোরেন্সের আদালত।

corrierefiorentino.corriere

Share This Article