কঠোর সীমান্ত নীতির কারণে বাড়ছে মানবপাচারকারীদের দৌরাত্ম্য; বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ থেকে একা পাড়ি জমানো অপ্রাপ্তবয়স্কদের ওপর চরম সহিংসতার চিত্র তুলে ধরল ইউনিসেফ, ইউএনএইচসিআর ও ওআইএম।
ইউরোপ অভিমুখী অপ্রাপ্তবয়স্ক অভিবাসীদের সার্বিক আগমন কমলেও তাদের সাগর ও স্থলপথের যাত্রা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে কোনো অভিভাবক ছাড়া একা পাড়ি জমানো শিশুদের সংখ্যা এবং তাদের ওপর চলা নির্যাতনের মাত্রা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ (UNICEF), শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর (UNHCR) এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা ওআইএম (IOM)-এর এক যৌথ প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, আইনি ও নিরাপদ পথ সংকুচিত হওয়া এবং সীমান্তগুলোতে কড়াকড়ি বৃদ্ধির কারণে শিশুরা বাধ্য হয়ে আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইউরোপে যেখানে ৪১ হাজার শিশু প্রবেশ করেছিল, ২০২৫ সালে তা কমে ৩১ হাজার ১০০ জনে নেমে এসেছে। তবে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মোট আগত শিশুদের মধ্যে অন্তত ২১ হাজার—অর্থাৎ ৬৭ শতাংশেরও বেশি শিশু কোনো অভিভাবক বা প্রাপ্তবয়স্কের সঙ্গ ছাড়াই একা ইউরোপে প্রবেশ করেছে। এই অভিভাবকহীন শিশুদের বড় অংশ আসছে বাংলাদেশ, সোমালিয়া, মিসর ও ইরিট্রিয়া থেকে। মধ্য ও পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় রুটে—যা মূলত ইতালি ও স্পেনের দিকে যায়—আগত শিশুদের মধ্যে একা চলা অপ্রাপ্তবয়স্কদের হার দাঁড়িয়েছে ৮৬ শতাংশে।
প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, ইতালি বা স্পেনের উপকূলে পৌঁছানো বেশিরভাগ শিশুর জন্য দেশগুলো কেবল একটি অস্থায়ী ট্রানজিট হিসেবে কাজ করে। অধিকাংশ অপ্রাপ্তবয়স্ক অভিবাসী পরবর্তীতে জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেন ও গ্রিসে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আনুষ্ঠানিক আবেদন জানায়। যদিও এদের মধ্যে বেশিরভাগই ১৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোর, তবে পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তগুলোতে শিশুদের বয়স আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। তথ্য অনুযায়ী, বুলগেরিয়ায় প্রবেশ করা একা শিশুদের ৩৭ শতাংশ এবং গ্রিসে ১৮ শতাংশের বয়স মাত্র ৫ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে।

ওআইএম-এর মহাপরিচালক অ্যামি পোপ (Amy Pope) পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেন, যখন নিরাপদ পথের সুযোগ সীমিত হয়ে যায় এবং মানুষ পাচারকারীদের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়, তখন শিশুদের নিজেদের সুরক্ষার দায়িত্ব নিজেদেরই নিতে হয়। কোনো শিশুরই একা এই ধরনের ভয়াবহ বিপদের মুখে পড়া উচিত নয়। তথ্যানুযায়ী, মধ্য ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় রুটে যাতায়াতকারী শিশুদের প্রায় ৬০ শতাংশ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যেখানে লিবিয়াকে নির্যাতনের মূল কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া বলকান রুটে ৩৭ শতাংশ এবং পশ্চিম ভূমধ্যসাগরে ৩৮ শতাংশ শিশু সহিংসতার শিকার হয়েছে। সশস্ত্র গোষ্ঠী ও পাচারকারীদের হাতে শিশুদের জোরপূর্বক শ্রম, মুক্তিপণের জন্য অপহরণ এবং বিশেষ করে মেয়েশিশুদের চরম যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে।
একই সময়ে ইতালীয় গবেষণা সংস্থা ‘ইদোস’ (Idos)-এর তথ্যে জানা গেছে, ২০২৫ সালে ভূমধ্যসাগরে অভিবাসীদের মৃত্যুর হার প্রায় ১৪৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। নৌকায় থাকা মানুষের মধ্যে প্রাণহানির হার আগের বছরের ১.৯৫ শতাংশ থেকে একলাফে ৪.৬৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। সামগ্রিক আগমন কমলেও মৃত্যুর সংখ্যা পূর্ববর্তী বছরের চেয়ে কয়েকশ বেশি। জাতিসংঘ সংস্থাগুলো স্পষ্ট করেছে, প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা নথিভুক্ত পরিসংখ্যারের চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ কঠোর করে অভিবাসন ঠেকানো সম্ভব নয়, বরং এতে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের অপ্রাপ্তবয়স্কদের জীবন আরও বেশি অনিশ্চয়তা ও পাচারকারীদের শোষণের মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
ইউরোপে একা আসা শিশু অভিবাসীর সংখ্যা বাড়ছে; ২০২৫ সালে ৩১ হাজার শিশুর মধ্যে ২১ হাজারই ছিল অপ্রাপ্তবয়স্ক ও অভিভাবকহীন, ঝুঁকিপূর্ণ পথে।
repubblica


