২০১৬ সালের ঢাকার সেই নৃশংস জঙ্গি হামলায় প্রাণ হারানো ইতালীয় নাগরিক ক্রিস্টিয়ান রসির স্মৃতি রক্ষার্থে ইতালির উদিনে শহরের একটি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তিন মেধাবী শিক্ষার্থীকে বিশেষ আর্থিক বৃত্তি ও সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে।
উদিনে, ইতালি
প্রায় এক দশক আগে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার গুলশানে সংঘটিত ভয়াবহ জঙ্গি হামলায় প্রাণ হারিয়েছিলেন ৯ জন ইতালীয় নাগরিক। তাঁদেরই একজন ছিলেন ক্রিস্টিয়ান রসি (Cristian Rossi)। সুদূর ইতালির ফ্রিউলি (Friuli) অঞ্চলের এই কৃতি সন্তানের স্মৃতিকে অম্লান করে রাখতে তাঁর পরিবার এক অনন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সম্প্রতি ইতালির উদিনে (Udine) শহরের বিখ্যাত কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘মালিনিয়ানি ইনস্টিটিউট’ (Istituto Malignani di Udine)-এ তিন মেধাবী শিক্ষার্থীকে ‘ক্রিস্টিয়ান রসি মেমোরিয়াল মেধাবৃত্তি’ প্রদান করা হয়েছে।
উল্লেখ্য যে, ২০১৬ সালের ১ জুলাই ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে তথাকথিত ইসলামিক স্টেট বা আইএস (ISIS)-এর অনুসারী জঙ্গিরা যে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল, তাতে মোট ২২ জন নিরীহ মানুষ নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ৯ জন ইতালীয় নাগরিক ছিলেন, যাঁদের মধ্যে ক্রিস্টিয়ান রসি এবং মার্কো তোন্দাত (Marco Tondat) নামে ফ্রিউলি অঞ্চলের দুই ব্যক্তিও ছিলেন। এই মর্মান্তিক ঘটনার পর থেকে গত দশ বছর ধরে ক্রিস্টিয়ানের তিন বোন— দানিয়েলা, গ্যাব্রিয়েলা এবং ক্রিস্টিনা তাঁদের ভাইয়ের স্মৃতি রক্ষার্থে নানা সামাজিক ও শিক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন।
এই ধারাবাহিকতায় মালিনিয়ানি ইনস্টিটিউটের ‘মেকাট্রনিক্স’ (Meccatronica) বিভাগের প্রথম বর্ষের সেরা তিন শিক্ষার্থীর হাতে এই মেধাবৃত্তি তুলে দেওয়া হয়। ক্রিস্টিয়ান রসি নিজেও একসময় এই প্রতিষ্ঠানে মেকাট্রনিক্স বিষয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। এ বছর বৃত্তিপ্রাপ্ত প্রত্যেক শিক্ষার্থীর মেধার মানদণ্ড ছিল ঈর্ষণীয়। প্রত্যেকের পরীক্ষার গড় নম্বর বা গ্রেড পয়েন্ট ৮-এর উপরে ছিল এবং একজনের ক্ষেত্রে তা ৯-ও ছাড়িয়ে গেছে। বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের সম্মাননা হিসেবে একটি করে বিশেষ নীল রঙের টি-শার্ট উপহার দেওয়া হয়, যা বিশেষভাবে ক্রিস্টিয়ান রসির স্মৃতির প্রতি উৎসর্গ করা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক ‘ডিপ্লোমা উৎসব’ বা সমাবর্তন অনুষ্ঠানে (Festa dei diplomi) এই বৃত্তিগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়। মালিনিয়ানি ইনস্টিটিউট ইতালির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় অর্থনীতি ও কারিগরি ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রতি বছর এই সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকেন। এ বছর বিভিন্ন ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক তহবিল থেকে প্রায় ৫০টি মেধাবৃত্তি যোগ্য শিক্ষার্থীদের মাঝে বণ্টন করা হয়েছে, যা এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামাজিক গুরুত্বকে আরও ফুটিয়ে তোলে।
অনুষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান প্রধান শিক্ষিকা বা ডিরেক্টর এলিজাবেত্তা জানুজ্জি (Elisabetta Giannuzzi) আবেগময় বক্তব্য প্রদান করেন। এটি ছিল তাঁর দায়িত্বকাল চলাকালীন প্রথম সমাবর্তন উৎসব। তিনি বলেন, এই এক বছরে তিনি এই প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্য এবং শিক্ষার্থীদের মেধা দেখে অনেক কিছু শিখেছেন। তিনি ক্রিস্টিয়ান রসির পরিবারের এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন যে, এই ধরণের বৃত্তি তরুণ সমাজকে কেবল পড়াশোনায় নয়, বরং মানবিক মূল্যবোধেও সমৃদ্ধ হতে অনুপ্রাণিত করবে।
ঢাকার সেই কালো অধ্যায়ের স্মৃতি যখন অনেক ক্ষেত্রেই ধূসর হয়ে আসছে, তখন ইতালির মাটিতে ক্রিস্টিয়ানের পরিবারের এই শিক্ষামূলক কার্যক্রম প্রমাণ করে যে, শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করে একটি সুস্থ ও শিক্ষিত সমাজ গঠন করা সম্ভব। এই উদ্যোগের মাধ্যমে যেমন মেধাবী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার পথ সুগম হচ্ছে, তেমনি হাজার মাইল দূরে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া একটি করুণ ঘটনার স্মৃতিও বেঁচে থাকছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। ইতালিতে বসবাসরত বাংলাদেশি অভিবাসীদের কাছেও এই ঘটনাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি দুই দেশের মানুষের মধ্যকার গভীর সহমর্মিতা এবং সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে কাজ করছে।
ঢাকায় আইএস হামলায় নিহত ইতালীয় প্রকৌশলী ক্রিশ্চিয়ান রোসির স্মরণে ১০ বছর ধরে উদিনের মালিনিয়ানি ইনস্টিটিউটে মেধাবী মেকাট্রনিক্স শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে।
rainews


