২০২৫ সালে ২০ হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি লিবিয়া হয়ে অবৈধভাবে ইতালিতে প্রবেশ করেছেন। জনপ্রতি ১৭ হাজার ডলার পর্যন্ত ব্যয়ে এই বিপজ্জনক যাত্রায় আন্তর্জাতিক পাচারকারী ও উদ্ধারকারী এনজিওর ভূমিকা নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক ও আইনি তদন্ত।
ইতালিতে অবৈধ পথে অভিবাসীদের প্রবেশের তালিকায় এবারও শীর্ষে উঠে এসেছে বাংলাদেশের নাম। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে মাস পর্যন্ত ২০,১৬৪ জন বাংলাদেশি লিবিয়া হয়ে সমুদ্রপথে ইতালিতে পৌঁছেছেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত কোনো দেশ না হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ থেকে এই বিশাল সংখ্যক মানুষের অবৈধ অনুপ্রবেশ ইতালীয় প্রশাসন ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে ভাবিয়ে তুলেছে। বিশেষ করে উদ্ধারকারী এনজিওগুলোর ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্রের বিশাল আর্থিক বাণিজ্যের বিষয়টি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
এনজিওর ভূমিকা ও আইনি তদন্ত
গত ১১ থেকে ১৩ মে’র মধ্যে ‘সি ওয়াচ ৫’ (Sea Watch 5) নামক একটি জার্মান এনজিও-র জাহাজ ভূমধ্যসাগর থেকে ১৬৬ জন অভিবাসীকে উদ্ধার করে, যাদের মধ্যে ১৫০ জনেরও বেশি ছিলেন বাংলাদেশি। ইউরোপীয় সীমান্ত রক্ষা সংস্থা ফনটেক্স (Frontex)-এর একটি ড্রোন ক্যামেরায় ধরা পড়েছে এক চাঞ্চল্যকর দৃশ্য। লিবিয়া উপকূল থেকে প্রায় ২৭ মাইল দূরে মুখোশধারী পাচারকারীরা একটি শক্তিশালী স্পিডবোটে করে অভিবাসীদের ওই এনজিও জাহাজের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। এই ঘটনায় ‘সি ওয়াচ ৫’-এর ক্যাপ্টেনের বিরুদ্ধে অবৈধ অভিবাসনে মদত দেওয়ার অভিযোগে ব্রিনডিসি (Brindisi) প্রসিকিউশন তদন্ত শুরু করেছে। তদন্তকারীদের মতে, অভিবাসীরা বিপদে পড়ে উদ্ধার হওয়ার পরিবর্তে পূর্বপরিকল্পিতভাবে এনজিও জাহাজের দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন।

পাচারচক্রের রুট ও আকাশচুম্বী খরচ
‘মিক্সড মাইগ্রেশন সেন্টার’ (MMC)-এর একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে ইতালি পৌঁছাতে একজন অভিবাসীকে গড়ে ১০ হাজার থেকে ১৪ হাজার মার্কিন ডলার খরচ করতে হয়। তবে লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর মুক্তিপণ ও অতিরিক্ত খরচের চাপে এই অঙ্ক ১৭ হাজার ডলার (প্রায় ২০ লাখ টাকা) পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে। এই পাচারচক্রের বার্ষিক লেনদেনের পরিমাণ ১৬০ থেকে ১৯০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
পাচারের এই বিশাল জালটি অত্যন্ত পরিকল্পিত। বাংলাদেশ থেকে দুবাই বা কুয়েত হয়ে প্রথমে মিশর এবং সেখান থেকে বিমানযোগে লিবিয়ার বেনগাজিতে (Benghazi) অভিবাসীদের নিয়ে যাওয়া হয়। এই যাত্রায় ‘দালাল’ নামে পরিচিত মধ্যস্থতাকারীরা বাংলাদেশের শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর ও কিশোরগঞ্জের মতো এলাকা থেকে লোক সংগ্রহ করে। যোগাযোগের জন্য তারা ‘ইমো’ (Imo)-এর মতো জনপ্রিয় মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে। লিবিয়ার বেনগাজি বিমানবন্দরে নামার পর খলিফা হাফতারের বাহিনীর নিয়ন্ত্রিত এলাকা দিয়ে তাদের সড়কপথে লিবিয়ার পশ্চিমে অবস্থিত জুয়ারা (Zuwara), জাবিয়া বা সাবরাথা বন্দরে নেওয়া হয়, যেখান থেকে নৌকায় করে ইতালির উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু হয়।
কেন ইতালিতেই এই আকর্ষণ?
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ইতালিতে থাকা বিশাল বাংলাদেশি কমিউনিটি বা ডায়াস্পোরা এই আকর্ষণের অন্যতম কারণ। রোম, মিলান, নেপলস ও মনফালকোন-এর মতো শহরগুলোতে থাকা বাংলাদেশিদের মধ্যে স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং অতীতে ইতালীয় সরকারের ‘রেগুলারাইজেশন’ বা কাগজ বৈধ করার বিভিন্ন ক্যাম্পেইন এই অবৈধ যাত্রাকে উৎসাহিত করছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ‘স্বপ্নের ইতালি’ (Dream Italy) শিরোনামে বিভিন্ন পেজ খুলে পাচারকারীরা মিথ্যা প্রচারণা চালাচ্ছে এবং এনজিও জাহাজের ছবি দেখিয়ে অভিবাসীদের প্রলুব্ধ করছে যে, মাঝসমুদ্রে কেউ তাদের ঠিকই উদ্ধার করে নিয়ে যাবে।
উপসংহার ও বর্তমান পরিস্থিতি
বর্তমানে ল্যাম্পেডুসা ও ইতালির অন্যান্য বন্দরে পৌঁছানো অভিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশিরাই প্রথম জাতীয়তা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। যদিও আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অর্থনৈতিক কারণে আসা এসব অভিবাসীদের রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ, তবুও ইতালিতে প্রবেশের সহজ সুযোগ ও পূর্ববর্তী অভিবাসীদের সহায়তা তাদের এই বিপজ্জনক পথে ঠেলে দিচ্ছে। ব্রিনডিসি প্রসিকিউশনের তদন্তে যদি এনজিও ও পাচারকারীদের সরাসরি যোগসাজশ প্রমাণিত হয়, তবে ইতালির অভিবাসন নীতিতে আরও বড় ধরনের কড়াকড়ি আসতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
বাংলাদেশ থেকে লিবিয়া হয়ে ইতালায় অনিয়মিত অভিবাসনের নেটওয়ার্কে একজন অভিবাসীর যাত্রায় প্রায় ১০–১৭ হাজার ডলার ব্যয় হয়; পুরো রুটটি আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
ilgiornale


