কাসালোত্তিতে তিন বাংলাদেশিকে খুনের দায়ে অভিযুক্ত শাহাদাত হোসেনের রাজনৈতিক সহকর্মীর মিনিমার্কেটে আগুন; রোমের প্রবাসী সমাজে দানা বাঁধা অভ্যন্তরীণ সংঘাতের চরম বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন তদন্তকারীরা।
রোম, ইতালি
ইতালির রাজধানী রোমের অন্যতম ব্যস্ত এলাকা পিয়াজ্জালে ফ্লামিনিওতে এক বাংলাদেশি বিএনপি নেতার মিনিমার্কেটে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। গত শুক্রবার ও শনিবারের মধ্যবর্তী রাত আনুমানিক ২টার দিকে সংঘটিত এই অগ্নিকাণ্ডকে কেবল একটি নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে দেখছে না স্থানীয় পুলিশ। বরং তারা ধারণা করছে, গত ২৫ জুন কাসালোত্তিতে এক বাংলাদেশি পরিবারের তিন সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনার জেরে এটি একটি পরিকল্পিত প্রতিশোধমূলক হামলা বা ‘ভেন্ডেটা’ হতে পারে।
অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহতা ও প্রাথমিক তদন্ত
পিয়াজ্জালে ফ্লামিনিও এলাকার ২২ নম্বর ভবনে অবস্থিত ওই দোকানটির মালিক শাহ তৌহিদ কাদের। তিনি ইতালিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) অন্যতম শীর্ষ নেতা হিসেবে পরিচিত। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, মাঝরাতে হঠাৎ করে দোকানটিতে আগুনের লেলিহান শিখা দেখা যায় এবং মুহূর্তের মধ্যেই পুরো এলাকা কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনলেও ততক্ষণে দোকানের ভেতরের আসবাবপত্র, মালামাল ও মূল্যবান সরঞ্জাম পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এই ঘটনায় তৌহিদ কাদেরের ব্যাপক আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
রোম পুলিশের একটি বিশেষ দল ইতিমধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। তারা খতিয়ে দেখছে এটি কোনো শর্ট সার্কিট থেকে সৃষ্ট দুর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগানো হয়েছে। তবে তদন্তকারীদের বিশেষ মনোযোগ এখন কাসালোত্তি হত্যাকাণ্ডের সাথে এই আগুনের যোগসূত্র স্থাপনের দিকে।

কাসালোত্তি হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য ও যোগসূত্র
পুলিশি সন্দেহের প্রধান কারণ হলো, কাসালোত্তিতে তিন খুনের দায়ে অভিযুক্ত পলাতক আসামি শাহাদাত হোসেন এবং এই দোকানের মালিক শাহ তৌহিদ কাদের একই রাজনৈতিক দলের সদস্য। কাসালোত্তির সেই মর্মান্তিক ঘটনায় ৪০ বছর বয়সী কামাল উদ্দিন, তার ৩৮ বছর বয়সী স্ত্রী মমতাজ হোসনে জাহান এবং তাদের আট বছরের কন্যা ইসলাম আরওয়াকে নিজ বাসায় অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল। সেই হত্যাকাণ্ড থেকে কেবল তাদের ছোট ছেলে আমির বেঁচে যায়, যে বর্তমানে পুলিশের বিশেষ সুরক্ষায় রয়েছে।
তদন্তে জানা গেছে, খুনি শাহাদাত হোসেন গত এক বছর ধরে নিহত কামাল উদ্দিনের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা ও গয়না দাবি করে আসছিল। কামাল উদ্দিন কমিউনিটির অনেকের কাছেই শাহাদাতের এই চাঁদাবাজি ও হয়রানির কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু খুনি শাহাদাত রোমে বিএনপির একজন পরিচিত মুখ হওয়ায় তার রাজনৈতিক প্রভাবের ভয়ে কেউ তাকে বাধা দেওয়ার সাহস পায়নি। পুলিশের ধারণা, খুনি শাহাদাতের ওপর জমানো ক্ষোভ থেকেই বিক্ষুব্ধ কেউ তার রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠদের ওপর এই ধরণের প্রতিশোধমূলক হামলা চালিয়ে থাকতে পারে।
খুনি শাহাদাতের পলাতক থাকা ও রাজনৈতিক প্রভাব
হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই শাহাদাত হোসেন গা ঢাকা দিয়েছে। রোম পুলিশের স্কোয়াড মোবাইল বিভাগের প্রধান জুসেপ্পে রবার্তো পিতিত্তোর নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী দল তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছে। তবে পুলিশ মনে করছে, শাহাদাতকে আত্মগোপনে থাকতে এবং ভুয়া পরিচয়পত্র তৈরি করে পালিয়ে যেতে তার রাজনৈতিক সহকর্মী বা প্রভাবশালী কোনো মহল পর্দার অন্তরাল থেকে সহায়তা করছে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, কাসালোত্তি হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশি কমিউনিটির একটি অংশ খুনিকে সমাজচ্যুত করার বদলে নিহত মমতাজ হোসনে জাহানের চারিত্রিক অপবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। এই ধরণের অমানবিক আচরণ ও খুনিকে পরোক্ষভাবে রক্ষা করার প্রচেষ্টা কমিউনিটির ভেতরে চরম উত্তেজনা ও বিভক্তি তৈরি করেছে। গোয়েন্দাদের মতে, পিয়াজ্জালে ফ্লামিনিওতে তৌহিদ কাদেরের দোকানে আগুন লাগার ঘটনাটি রোমের বাংলাদেশি সমাজে চলমান এক ‘গোপন যুদ্ধের’ নতুন অধ্যায় মাত্র।
বর্তমান পরিস্থিতি ও পরবর্তী পদক্ষেপ
পিয়াজ্জালে ফ্লামিনিওর এই অগ্নিকাণ্ডের পর রোম প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। পুলিশ ওই এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে এবং সেই রাতে দোকানের আশেপাশে কাউকে ঘোরাঘুরি করতে দেখা গেছে কি না তা যাচাই করছে। রোম প্রসিকিউটর অফিসের সমন্বয়ে পরিচালিত এই তদন্তে কাসালোত্তি ট্র্যাজেডির শিকার হওয়া পরিবারের কোনো স্বজন বা শুভাকাঙ্ক্ষী এই ঘটনার সাথে জড়িত কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, খুনি শাহাদাত গ্রেপ্তার না হওয়া পর্যন্ত এবং কমিউনিটির অভ্যন্তরীণ এই রাজনৈতিক রেষারেষি বন্ধ না হলে রোমে বাংলাদেশিদের মধ্যে আরও সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়ে গেছে।
রোমে বাংলাদেশি বিএনপি নেতার মিনিমার্কেটে অগ্নিকাণ্ডকে কাসালোত্তি ট্রিপল হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধমূলক হামলা হতে পারে বলে সন্দেহ করছে পুলিশ; ঘটনাটির নাশকতার দিকটি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত চলছে।
roma.repubblica


