সরকারি নতুন ডিক্রিতে সীমান্ত ও ট্রানজিট এলাকা ঘোষিত হয়েছে উদিনে ও পর্ডেনোন; রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তিতে প্রশাসনিক জনবল বৃদ্ধির পাশাপাশি চালু হচ্ছে বিশেষ সীমান্ত কেন্দ্র।
ইতালির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় দুই প্রদেশ উদিনে (Udine) এবং পর্ডেনোনে (Pordenone) অভিবাসন ও রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। সরকারের নতুন এক ডিক্রির মাধ্যমে এই অঞ্চলগুলোকে ‘সীমান্ত ও ট্রানজিট এলাকা’ (Zone di frontiera e transito) হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এর ফলে এখন থেকে দেশটিতে আশ্রয়ের আবেদনগুলো ‘প্রসেডুরা আচ্চেলেরাতা’ (Procedura accelerata) বা দ্রুততম প্রক্রিয়ায় যাচাই-বাছাই করা সম্ভব হবে।
নতুন এই আইনি কাঠামোর অধীনে, যারা ইতালিতে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করবেন, তাদের নথিপত্র এবং দাবির সত্যতা মাত্র ১২ সপ্তাহের মধ্যে মূল্যায়ন করা হবে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ভূমধ্যসাগর বা লাম্পেডুসা (Lampedusa) উপকূল দিয়ে প্রবেশ করা অভিবাসীদেরও প্রয়োজনে এই দুই প্রদেশে স্থানান্তর করা হতে পারে। আবেদনকারীদের আবেদনের ফলাফল না আসা পর্যন্ত সরকার নির্ধারিত বিশেষ এলাকা বা পিএএফ (PAF – Procedura Accelerata di Frontiera) নামক কেন্দ্রগুলোতে অবস্থান করতে হবে।
আসন সংখ্যা ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি
উদিনে প্রদেশে এই বিশেষ প্রক্রিয়ার জন্য তিনটি স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। ক্যাভারজেরানি ব্যারাক (Caserma Cavarzerani), ভিয়া ব্রিগাতা রে (Via Brigata Re) এবং পন্তেব্বা (Pontebba)—এই তিন স্থানে মোট ১৪০টি আসন বরাদ্দ করা হয়েছে। তবে স্থানীয় প্রশাসন স্পষ্ট করেছে যে, এই আসন সংখ্যা ওই অঞ্চলের জন্য নির্ধারিত মোট শরণার্থী কোটার অতিরিক্ত নয়, বরং বিদ্যমান কোটার ভেতরেই এটি সমন্বয় করা হবে। ইতালির আরও ২৫টি প্রদেশে, যেমন—আস্তি (Asti) থেকে ভিচেনঞ্জা (Vicenza) পর্যন্ত, এ ধরনের কেন্দ্র সক্রিয় করার পরিকল্পনা রয়েছে।
আবেদনের এই বাড়তি চাপ সামলাতে উদিনে প্রিফেকচারে (Prefettura) প্রশাসনিক জনবল দ্বিগুণ করা হয়েছে। ত্রিয়েস্তে কমিশনের (Commissione di Trieste) অধীনে উদিনেতে একটি নতুন উপ-বিভাগ বা ‘সত্তোসেজিওনে’ (Sottosezione) তৈরি করা হয়েছে। এই বিভাগটি শুধুমাত্র দ্রুততম সীমান্ত প্রক্রিয়ার আবেদনগুলো তদারকি করবে। দক্ষ কর্মকর্তাদের পাশাপাশি এখানে পাঁচজন নতুন প্রশাসনিক কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

আইনি জটিলতা ও বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
সরকারি এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের আইনি ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। সাধারণত আশ্রয়ের আবেদন বাতিল হলে অধিকাংশ অভিবাসীই আদালতের দ্বারস্থ হন। কিন্তু দ্রুততম প্রক্রিয়ায় আপিল করার জন্য সময়সীমা অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। ত্রিয়েস্তে আদালতে (Tribunale di Trieste) বর্তমানে তীব্র জনবল সংকট রয়েছে, যার ফলে এত দ্রুত বিপুল সংখ্যক আইনি আপিল নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। উল্লেখ্য, গত সপ্তাহেই ত্রিয়েস্তে আদালত চারটি ভিন্ন রায়ে অভিবাসীদের পক্ষে রায় দিয়েছেন, কারণ সেখানে দ্রুততম প্রক্রিয়াটি আইনত সঠিক উপায়ে প্রয়োগ করা হয়নি বলে প্রমাণিত হয়েছে
ইতালীয় সলিডারিটি কনসোর্টিয়ামের (Consorzio Italiano di Solidarietà – ICS) সভাপতি জানফ্রাঙ্কো শিয়াভোনে এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। তার মতে, ইউরোপীয় আইন অনুযায়ী এই দ্রুততম প্রক্রিয়াটি কেবল ইউনিয়নের বহিরাগত সীমান্তগুলোর জন্য প্রযোজ্য হওয়া উচিত। তিনি মনে করেন, ফ্রুল্লি ভেনেজিয়া জুলিয়া (Friuli Venezia Giulia) অঞ্চলটি এমনিতেই বালকান রুট দিয়ে আসা অভিবাসীদের অন্যতম প্রধান গন্তব্য। এমতাবস্থায় এখানে নতুন করে সীমান্ত ট্রানজিট জোন তৈরি করা সরকারের একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, যার দায়ভারও সরকারকেই নিতে হবে।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য প্রভাব
ইতালিতে নতুন আসা অভিবাসীদের মধ্যে যারা রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য আবেদন করবেন, তাদের জন্য এই পরিবর্তন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১২ সপ্তাহের মধ্যে সিদ্ধান্ত চলে আসার অর্থ হলো—যাদের আশ্রয়ের স্বপক্ষে পর্যাপ্ত তথ্য বা বৈধ কারণ নেই, তাদের খুব দ্রুত দেশত্যাগের আদেশ পাওয়ার ঝুঁকি বাড়বে। তাই আইনি সহায়তা গ্রহণ এবং নথিপত্র সঠিকভাবে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে এখন অনেক বেশি সচেতন হতে হবে
সরকারের এই নতুন পদক্ষেপ আগামী দিনগুলোতে ইতালির অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় কী ধরনের প্রভাব ফেলে, তা এখন পর্যালোচনার বিষয়। তবে স্থানীয় প্রশাসন ও বিচার বিভাগের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব থাকলে এই দ্রুত প্রক্রিয়াটি দীর্ঘমেয়াদী আইনি লড়াইয়ের মুখে পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উদিনে ও পর্দেনোনেকে সীমান্ত ও ট্রানজিট অঞ্চল ঘোষণা করে ১২ সপ্তাহের দ্রুত আশ্রয়প্রক্রিয়া চালু করা হচ্ছে; উদিনে প্রাথমিকভাবে ১৪০টি বিশেষ আসন নির্ধারণ করা হয়েছে।
rainews


