কোকা-কোলার পূর্বসূরি কি ইতালীয় সন্ন্যাসীরা? ফ্লোরেন্সের প্রাচীন নথিতে নতুন চমক

5 Min Read

ইতালির ফ্লোরেন্সের একটি প্রাচীন আশ্রমের ওষুধালয়ে ১৯ শতকের এক গোপন রেসিপি আবিষ্কৃত হয়েছে, যা আধুনিক বিশ্বের জনপ্রিয় পানীয় কোকা-কোলার আদি ইতিহাস নিয়ে নতুন করে ভাবনার সুযোগ করে দিচ্ছে।

বিশ্বখ্যাত কোমল পানীয় কোকা-কোলার উদ্ভাবন নিয়ে দশকের পর দশক ধরে আমরা যা জেনে এসেছি, তাতে নতুন এক মাত্রা যোগ করেছে ইতালির ফ্লোরেন্সের একটি প্রাচীন আশ্রমের আবিষ্কার। ফ্লোরেন্সের ঐতিহাসিক সান মার্কো আশ্রমের (San Marco Monastery) ধুলোপড়া আর্কাইভে পাওয়া গেছে উনিশ শতকের একটি হলদেটে প্রচারপত্র। সেখানেই লুকিয়ে ছিল এমন এক পানীয়ের ফর্মুলা, যা বর্তমান সময়ের বিশ্বখ্যাত কোমল পানীয় কোকা-কোলার কয়েক দশক আগেই সেখানে তৈরি করা হতো।

আশ্রমের বর্তমান রেক্টর ফাদার ম্যানুয়েল রুশো পুরোনো নথিপত্র গোছানোর সময় হঠাৎ করেই এই চমকপ্রদ নথিটি খুঁজে পান। সেখানে ‘এলিক্সির ভিনোসো রিকোস্তিতুয়েন্তে’ (Elixir Vinoso Ricostituente) নামক একটি পানীয়ের প্রস্তুতপ্রণালী বিস্তারিতভাবে লেখা রয়েছে। এই নামের আক্ষরিক অর্থ হলো ‘শরীর চাঙা করার ওয়াইনভিত্তিক পানীয়’। নথিটি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এটি তৈরির প্রধান উপাদান ছিল ১০ গ্রাম বলিভিয়ান কোকা পাতা এবং ৩০ গ্রাম কোলা বাদাম, যা নির্দিষ্ট পরিমাণ ওয়াইনের সঙ্গে মিশ্রিত করা হতো।

সন্ন্যাসীদের সেই আমলে এটি কোনো সাধারণ তৃষ্ণা নিবারক পানীয় ছিল না; বরং এটি ব্যবহৃত হতো একটি শক্তিশালী টনিক হিসেবে। বার্ধক্যজনিত ক্লান্তি দূর করতে এবং অসুস্থ শরীর ও মনকে দ্রুত চাঙা করতে এই টনিকের জুড়ি ছিল না। ঐতিহাসিকদের ধারণা, এই রেসিপিটি ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ের। তখন ধর্মপ্রচারকদের মাধ্যমে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ বলিভিয়া থেকে ইতালিতে কোকা পাতা আনা হতো এবং সন্ন্যাসীরা সেই পাতার বিপণনে বেশ দক্ষ ছিলেন।

উল্লেখ্য যে, ১৯৬১ সালে কোকা পাতার ব্যবহার বিশ্বজুড়ে নিষিদ্ধ হওয়ার অনেক আগের এই ঘটনায় কোকা পাতার প্রাকৃতিক অ্যালকালয়েড ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়, যা বর্তমান সময়ে কোকেন তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। ফ্লোরেন্সের এই সন্ন্যাসীদের পানীয়ের সঙ্গে ১৮৮৬ সালে মার্কিন ফার্মাসিস্ট জন পেম্বারটনের উদ্ভাবিত কোকা-কোলার ফর্মুলার এক অদ্ভুত সাদৃশ্য রয়েছে। পেম্বারটনও কোকা পাতার নির্যাস ও কোলা বাদাম দিয়ে একটি সিরাপ তৈরি করেছিলেন। তবে তার ক্ষেত্রে ভিন্নতা ছিল মাধ্যমটিতে; তৎকালীন স্থানীয় মদসংক্রান্ত কঠোর আইনের কারণে তিনি ওয়াইনের পরিবর্তে কার্বনেটেড পানি ব্যবহার করেছিলেন।

ফাদার রুশোর এই আবিষ্কারের খবর ইতালির স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে প্রশ্ন ওঠে—তবে কি কোকা-কোলার আদি শিকড় যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টা নয়, বরং ইতালির ফ্লোরেন্সে? তবে এ বিষয়ে ফাদার রুশো বেশ সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। তিনি রসিকতা করে বলেন, ‘আমি কোকা-কোলার পক্ষ থেকে কোনো আইনি জটিলতা বা মামলা ডেকে আনতে চাই না। জন পেম্বারটন তার নিজস্ব রেসিপি উদ্ভাবন করেছিলেন যা ছিল অ্যালকোহলমুক্ত। আমাদের সান মার্কো ওষুধালয়েরও নিজস্ব একটি অনন্য রেসিপি ছিল।’

ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ফ্লোরেন্সের ভিয়া কাভুরে ১৪৩৬ সালে সান মার্কো আশ্রমটি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৪৬০ সাল থেকে সেখানে দরিদ্র মানুষের সেবায় একটি ওষুধালয় বা ফার্মাসি চালু করা হয়। রুশোর খুঁজে পাওয়া নথিপত্র অনুযায়ী, সন্ন্যাসীদের তৈরি এই পানীয়টি তখনকার সময়ে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল। এর প্রতিটি ডোজের দাম ছিল ২ থেকে ৬ ইতালীয় লিরা, যা বর্তমান ইউরোর হিসাবে এক সেন্টেরও কম। এটি সন্ন্যাসীদের ফার্মাসির অন্যতম শীর্ষ বিক্রিত পণ্য ছিল।

বর্তমানেও এই প্রাচীন ওষুধালয়টি চালু রয়েছে, যদিও ১৯৯৫ সালে এটিকে মূল ভবন থেকে সরিয়ে ফ্লোরেন্সের অন্য এক স্থানে নেওয়া হয়েছে। তবে এর মূল প্রাঙ্গণটি এখনো অবিকৃত রয়েছে। সেখানে ১৬০০-এর দশকের একটি মমি করা কুমির ছাদ থেকে ঝুলছে, যা তখনকার দিনে বিরল ঔষধি উপাদানের সংগ্রহের প্রতীক হিসেবে ওষুধের দোকানে প্রদর্শন করা হতো। আর্কাইভে শুধু এই রেসিপিই নয়, বরং বিশুদ্ধ অক্সিজেন, কনিয়াক এবং পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম স্পিরিটের পুরোনো লেবেলও পাওয়া গেছে, যা ওই সময়কার উন্নত চিকিৎসাবিদ্যার ইঙ্গিত দেয়।

কোকা-কোলার অনুপ্রেরণা নিয়ে এর আগেও স্পেনের ভ্যালেন্সিয়ার ‘কোলা কোকা’ নামক এক পানীয়ের কথা শোনা গিয়েছিল। তবে ফ্লোরেন্সের এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে, ১৯ শতকের ইউরোপ ও আমেরিকায় কোকা পাতা ও কোলা বাদামের ঔষধি ব্যবহার বেশ বিস্তৃত ছিল এবং সান মার্কোর সন্ন্যাসীরা সেই গবেষণায় অনেক এগিয়ে ছিলেন।

ফ্লোরেন্সের এক আশ্রমে উনিশ শতকের কোকা পাতা, কোলা বাদাম ও ওয়াইনভিত্তিক পানীয়ের রেসিপি মিলেছে, যা কোকা-কোলার সম্ভাব্য পূর্বসূরি ছিল কি না—সেই প্রশ্ন নতুন করে তুলেছে।

the dailystar

TAGGED:
Share This Article