ইতালির জাতীয় পরিসংখ্যান সংস্থা ইস্তাত (Istat)-এর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইতালির জন্মহারের আশঙ্কাজনক পতন এবং মৃত্যুহারের আধিক্যজনিত শূন্যতা পূরণ করছে নতুন আসা অভিবাসীরা। জনসংখ্যার স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বিদেশি জনশক্তির গুরুত্ব এখন অনস্বীকার্য।
ইতালির বর্তমান জনতাত্ত্বিক সংকট মোকাবিলায় বিদেশি অভিবাসীদের আগমন এখন আর কেবল পরিসংখ্যানের বিষয় নয়, বরং এটি দেশের অস্তিত্ব রক্ষার প্রধান হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইস্তাতের ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ইতালির নিজস্ব জনসংখ্যা যে হারে কমছে, তা প্রায় নিখুঁতভাবে ভারসাম্যপূর্ণ হচ্ছে নতুন আসা অভিবাসীদের মাধ্যমে। এই প্রবণতা বজায় না থাকলে ইতালির মোট জনসংখ্যা সরাসরি হ্রাসের মুখে পড়ত, যা দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোর জন্য এক বিশাল ঝুঁকি তৈরি করত।
জন্ম ও মৃত্যুহারের ব্যবধান এবং অভিবাসনের প্রভাব
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইতালিতে নিট অভিবাসনের (Net Migration) সংখ্যা ২ লক্ষ ৯৬ হাজারে উন্নীত হয়েছে। এই সংখ্যাটি ইতালির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ দেশটির জন্ম ও মৃত্যুহারের মধ্যকার প্রাকৃতিক ঘাটতিও ছিল প্রায় ২ লক্ষ ৯৬ হাজার। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, আলোচ্য বছরে ইতালিতে মাত্র ৩ লক্ষ ৫৫ হাজার শিশু জন্মগ্রহণ করেছে, যার বিপরীতে মৃত্যু হয়েছে প্রায় ৬ লক্ষ ৫২ হাজার মানুষের। অর্থাৎ, জন্ম ও মৃত্যুর এই বিশাল ব্যবধানের ফলে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা বিদেশি অভিবাসীদের আগমনের ফলে পূরণ হয়েছে। আগের বছরের তুলনায় নিট অভিবাসনের এই হার ইতালির জনসংখ্যাকে একটি স্থিতিশীল অবস্থানে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে
মেধা পাচার এবং শিক্ষিত জনশক্তির রূপান্তর
ইতালির অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থান ও মেধা পাচার বা ‘ব্রেইন ড্রেন’ (Brain Drain) সংক্রান্ত তথ্যেও এক নতুন চিত্র ফুটে উঠেছে। ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ইতালির দক্ষিণাঞ্চল বা মেজোজোর্নো (Mezzogiorno) এলাকা থেকে প্রায় ১ লক্ষ ৫০ হাজার তরুণ গ্র্যাজুয়েট উন্নত জীবনের আশায় দেশটির কেন্দ্র ও উত্তরাঞ্চলে পাড়ি জমিয়েছেন। স্থানীয় মেধাবীদের এই এলাকা ত্যাগের ফলে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা পূরণে এগিয়ে আসছেন বিদেশি শিক্ষিত জনশক্তি। পরিসংখ্যান বলছে, ইতালির প্রায় ৭৮ হাজার স্নাতক বা উচ্চশিক্ষিত তরুণ উন্নত সুযোগের খোঁজে দেশের বাইরে চলে গেলেও, প্রায় ৮৮ হাজার বিদেশি স্নাতক একই সময়ে ইতালিতে এসে কর্মসংস্থানে যুক্ত হয়েছেন। অর্থাৎ, মেধা পাচারের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বিদেশি ডিগ্রিধারীরা ইতালির অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখছেন।

অভ্যন্তরীণ স্থানান্তর ও আইনি কড়াকড়ি
ইতালির অভ্যন্তরীণ চলাচলের ক্ষেত্রেও অভিবাসীদের ভূমিকা অত্যন্ত সক্রিয়। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জাতীয় পর্যায়ে অভ্যন্তরীণ স্থানান্তরের হার ৫.১ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে এক শহর থেকে অন্য শহরে স্থানান্তরের হার প্রায় ১৪.৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, অভিবাসীরা কর্মসংস্থানের প্রয়োজনে ইতালির বিভিন্ন প্রান্তে অত্যন্ত সচল এবং তারা শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী নিজেদের স্থান পরিবর্তন করছেন। তবে কিছু নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চল থেকে অভিবাসনের হার প্রায় ১৫.৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যার প্রধান কারণ হিসেবে নাগরিকত্ব প্রাপ্তি এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় কঠোর আইনি বিধিনিষেধকে দায়ী করা হচ্ছে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও গুরুত্ব
ইস্তাতের এই প্রতিবেদনটি নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি বিশেষ বার্তা বহন করছে। ইতালির জনসংখ্যা সচল রাখতে এবং মেধা পাচারের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে অভিবাসীদের অংশগ্রহণ এখন আর ঐচ্ছিক নয়, বরং এটি একটি জাতীয় আবশ্যকতায় পরিণত হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে ইতালির সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও পেনশন কাঠামো টিকিয়ে রাখতে হলে এই নতুন আসা জনশক্তিকে কার্যকরভাবে মূলধারায় সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, ইতালির ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধি অনেকাংশেই নির্ভর করছে অভিবাসন নীতিকে আরও বাস্তবসম্মত এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক করার ওপর। হ্যালো ইতালি পেজের সাথেই থাকুন সব খবরের দ্রুত আপডেটের জন্য।
বিদেশি অভিবাসীরাই ২০২৫ সালে ইতালির জনসংখ্যা হ্রাস ঠেকাতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছেন; বাংলাদেশ ও মরক্কো থেকে আসা নতুন অভিবাসীরা এ পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
ilsole24ore


