ভূমধ্যসাগরে উদ্ধার অভিযান নিয়ে ইতালি সরকার ও এনজিওর মধ্যে নতুন সংঘাত

4 Min Read

ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কড়া অবস্থানের জবাবে উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো জানিয়েছে যে তারা আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন মেনেই কাজ করছে; পাশাপাশি অভিবাসীদের দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তেজনা।

ভূমধ্যসাগরের বিপজ্জনক পথে অভিবাসীদের উদ্ধার কার্যক্রম নিয়ে ইতালির কেন্দ্রীয় সরকার এবং বেসরকারি উদ্ধারকারী সংস্থাগুলোর (NGO) মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ আবারও প্রকাশ্যে এসেছে। ইতালির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাত্তেও পিয়ান্তেদোসির সাম্প্রতিক কিছু মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী সংস্থা ‘এসওএস হিউম্যানিটি’ (SOS Humanity) সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, তাদের সকল কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক নীতিমালা মেনেই পরিচালিত হচ্ছে। ইতালীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা ভিমিনালে (Viminale) এবং এই সংস্থাগুলোর মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া এই বাকযুদ্ধ ইউরোপের অভিবাসন রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

উদ্ধারকারী সংস্থাগুলোর পাল্টা যুক্তি

পিয়ান্তেদোসির এই বক্তব্যের কড়া জবাব দিয়েছেন এসওএস হিউম্যানিটির ইতালীয় মুখপাত্র ফ্লোর মুরার্দ। তিনি তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরে জানান যে, ইতালিতে প্রতি বছর যত অভিবাসী সমুদ্রপথে পৌঁছান, তার ১০ শতাংশের কম মানুষকে এনজিওর জাহাজগুলো উদ্ধার করে থাকে। অর্থাৎ, সিংহভাগ অভিবাসী হয় নিজেদের চেষ্টায় উপকূলে পৌঁছান অথবা ইতালীয় কোস্টগার্ডের মাধ্যমে উদ্ধার হন। সংস্থাটি আরও মনে করিয়ে দেয় যে, ২০১৪ সালে ইতালির নিজস্ব উদ্ধার অভিযান ‘মারে নস্ট্রাম’ (Mare Nostrum) বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সমুদ্রে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা পূরণ করতেই বেসরকারি সংস্থাগুলো কাজ শুরু করে।

জার্মান এনজিও ‘সি-ওয়াচ’ (Sea-Watch) এই বিতর্কে যোগ দিয়ে জানিয়েছে, কোনো দেশই তার পতাকাবাহী জাহাজকে আন্তর্জাতিক উদ্ধার কাজ থেকে বিরত রাখতে পারে না। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, সমুদ্রে বিপদে পড়া যে কাউকে উদ্ধার করা এবং তাদের একটি নিরাপদ স্থানে (Place of Safety) পৌঁছে দেওয়া জাহাজের ক্যাপ্টেনের আইনি বাধ্যবাধকতা।

আদালতের রায় ও আইনি পরিস্থিতি

সাম্প্রতিক সময়ে ইতালীয় সরকারের নেওয়া বেশ কিছু কঠোর প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দেশটির আদালতগুলো এনজিওগুলোর পক্ষেই রায় দিয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে পরিচালিত একটি উদ্ধার অভিযানের পর ‘হিউম্যানিটি ১’ (Humanity 1) জাহাজের ওপর যে জরিমানা ও আটকাদেশ দেওয়া হয়েছিল, চলতি বছরের মার্চ মাসে কিইতি (Chieti) আদালত তা স্থগিত করে দেয়। পরবর্তীতে জুলাই মাসে ওর্তোনা (Ortona) আদালতও একই জাহাজের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞাকে অবৈধ ঘোষণা করে। আদালতের পর্যবেক্ষণে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, উদ্ধারকৃত অভিবাসীদের জন্য লিবিয়া কোনোভাবেই ‘নিরাপদ বন্দর’ নয়। ফলে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এনজিওগুলো উদ্ধারকৃতদের ইতালিতে নিয়ে আসতে বাধ্য ছিল।

বাংলাদেশি অভিবাসীদের ওপর প্রভাব ও ভবিষ্যৎ

ভূমধ্যসাগরের এই রুটটি ব্যবহারকারী অভিবাসীদের মধ্যে একটি বিশাল অংশ বাংলাদেশের নাগরিক। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি বছর হাজার হাজার বাংলাদেশি উন্নত জীবনের আশায় লিবিয়া হয়ে ইতালির পথে পা বাড়ান। ইতালি সরকার ও এনজিওগুলোর মধ্যে এই রশি টানাটানি সরাসরি এই অভিবাসীদের নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলে। উদ্ধার অভিযানে কোনো বাধা বা আইনি জটিলতা তৈরি হলে সাগরে মৃত্যুর ঝুঁকি আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

বর্তমানে ইতালি সরকার চাইছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) অন্য সদস্য দেশগুলো যেন অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। অন্যদিকে, মানবাধিকার সংস্থাগুলো জোর দিচ্ছে মানবিকতাকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখার ওপর। এই দ্বিমুখী অবস্থানের কারণে সামনের দিনগুলোতে সমুদ্র উদ্ধার কার্যক্রম এবং ইতালীয় বন্দরগুলোতে অভিবাসীদের অবতরণ প্রক্রিয়া আরও জটিল আইনি লড়াইয়ের সম্মুখীন হতে পারে। এর ফলে ইতালির অভিবাসন নীতিতে বড় ধরনের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

SOS Humanity বলছে, আন্তর্জাতিক আইন মেনেই এনজিওগুলো সমুদ্রে উদ্ধারকাজ চালায়; অন্যদিকে ইতালি উদ্ধার হওয়া অভিবাসীদের দায়িত্ব ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে আরও সমানভাবে ভাগ করার দাবি জানাচ্ছে।

stranieriinitalia

Share This Article