ইতালির নাপোলিতে পুলিশের বিশাল অভিযান: ৩৪ লক্ষের বেশি ক্ষতিকর পণ্য জব্দ, অভিযুক্ত তিন বাংলাদেশি ব্যবসায়ী

4 Min Read

ইতালির নাপোলিতে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ এবং অনিরাপদ পণ্য বিক্রির অভিযোগে বিশাল এক অভিযান পরিচালনা করেছে দেশটির অর্থ বিভাগীয় পুলিশ ‘গার্দিয়া দি ফিনাঞ্জা’ (Guardia di Finanza)। এই অভিযানে প্রায় ৩৪ লক্ষের বেশি বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর পণ্য জব্দ করা হয়েছে এবং এই অবৈধ বাণিজ্যের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে তিন জন বাংলাদেশি ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

ইতালির দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর নাপোলিতে (Naples) সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং অবৈধ পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের সাফল্য পেয়েছে স্থানীয় আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী। নাপোলি প্রাদেশিক কমান্ডের নির্দেশে ‘সেকেন্ড মেট্রোপলিটান অপারেশনাল ইউনিট’-এর সদস্যরা শহরের অন্যতম ব্যস্ত এলাকা সান লোরেনজোতে (San Lorenzo) এই বিশেষ অভিযানটি পরিচালনা করেন। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ওই এলাকার তিনটি পৃথক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে একযোগে তল্লাশি চালানো হলে বেরিয়ে আসে বিপুল পরিমাণ অনিরাপদ পণ্যের মজুদ।

জব্দকৃত পণ্যের বিবরণ ও অনিয়ম

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জব্দকৃত মালামালের সংখ্যা ৩৪ লক্ষ ৪ হাজারেরও বেশি। উদ্ধারকৃত সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ ইমিটেশন জুয়েলারি বা কৃত্রিম গয়না (Bigiotteria), বিভিন্ন ধরনের রঙিন পুঁতি (Perline), চুল সাজানোর সরঞ্জাম এবং নখের সাজসজ্জার জন্য ব্যবহৃত নানা উপকরণ।

তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জব্দকৃত এই পণ্যগুলো বিক্রির জন্য প্রদর্শিত হলেও সেগুলোতে ইতালীয় আইন অনুযায়ী বাধ্যতামূলক কোনো তথ্য ছিল না। বিশেষ করে পণ্যের উৎপাদনকাল, এটি তৈরির উপাদানসমূহ (Composition), গুণগত মান এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—পণ্যটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি আছে কি না, সে সংক্রান্ত কোনো লেবেল বা নির্দেশনা পণ্যগুলোর গায়ে পাওয়া যায়নি। ইতালির ভোক্তা অধিকার আইন অনুযায়ী, যথাযথ লেবেল এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত তথ্য ব্যতীত কোনো রাসায়নিক বা প্রসাধনী জাতীয় পণ্য বিক্রি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

অভিযুক্ত বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ও আইনি পদক্ষেপ

এই ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন তিন জন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্যবসায়ী, যারা ওই তিনটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মালিক বা দায়িত্বশীল পদে আসীন ছিলেন। ইতালীয় গণমাধ্যমে তাদের পরিচয় সরাসরি প্রকাশ না করা হলেও জানানো হয়েছে যে, তারা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত। পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে ইতালির ‘ভোক্তা সুরক্ষা কোড’ (Codice del Consumo) লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে।

অভিযুক্ত এই তিন ব্যবসায়ীর নাম ও প্রতিষ্ঠানের তথ্য স্থানীয় চেম্বার অফ কমার্স (Camera di Commercio) বা শিল্প ও বাণিজ্য দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। সেখানে তাদের বিরুদ্ধে বড় অংকের প্রশাসনিক ও আর্থিক জরিমানা (Sanzioni amministrative) আরোপের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ইতালিতে এই ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে পণ্য জব্দ করার পাশাপাশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল বা স্থগিত করার মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার বিধান রয়েছে।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও সচেতনতা

গার্দিয়া দি ফিনাঞ্জা জানিয়েছে, বাজারে এই ধরনের অনিরাপদ পণ্যের সরবরাহ কেবল বৈধ ব্যবসায়ীদের জন্য ক্ষতির কারণ নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের জন্য চর্মরোগ বা অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যগত সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে সস্তা মানের গয়না বা নেইল আর্টের সামগ্রীতে অনেক সময় বিষাক্ত সীসা বা নিকেল ব্যবহার করা হয়, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের কঠোর মানদণ্ডে নিষিদ্ধ।

এই অভিযানের পর ইতালিতে বসবাসরত বাংলাদেশি ব্যবসায়ী মহলে এক ধরনের সতর্কবার্তা ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ প্রবাসীদের পরামর্শ দিয়েছেন যেন তারা পণ্য আমদানির সময় অবশ্যই ইতালীয় ভাষার লেবেল এবং ‘সিই’ (CE) মার্কিং নিশ্চিত করেন। সঠিক নিয়ম না মেনে ব্যবসা পরিচালনা করলে একদিকে যেমন বড় অংকের আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি থাকে, অন্যদিকে দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হয়।

নাপোলি পুলিশ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ভবিষ্যতে ভোক্তা অধিকার রক্ষা এবং জাল বা মানহীন পণ্য রোধে এই ধরনের আকস্মিক অভিযান অব্যাহত থাকবে। বিশেষ করে জনবহুল এলাকা এবং বিদেশি ব্যবসায়ীদের কেন্দ্রগুলোতে তদারকি আরও জোরদার করা হবে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বর্তমানে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও, তদন্তে যদি কোনো বড় ধরনের জালিয়াতি ধরা পড়ে তবে বিষয়টি ফৌজদারি আদালত পর্যন্ত গড়াতে পারে।

নেপলসে গার্দিয়া দি ফিনাঞ্জা ৩৪ লাখের বেশি অনিরাপদ পণ্য জব্দ করেছে; এসব পণ্যে স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, সংমিশ্রণ ও মানসংক্রান্ত বাধ্যতামূলক তথ্য অনুপস্থিত ছিল।

napoli.corriere

Share This Article