ইউরোপের নতুন অভিবাসন নীতির কবলে আফগান তরুণ: বেলজিয়াম থেকে ফেরত পাঠিয়ে ইতালিতে অনিশ্চিত জীবন

4 Min Read

ডাবলিন চুক্তির কড়াকড়িতে বেলজিয়ামে তিন বছর থাকার পরও ইতালিতে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা ওয়াহিদুল্লাহ; উদিনে শহরে আশ্রয়হীন বহু অভিবাসীর জীবনে এখন নেমে এসেছে চরম অনিশ্চয়তা।

ইতালির উত্তরাঞ্চলীয় শহর উদিনে (Udine) বর্তমানে এক চরম মানবিক সংকটের মুখোমুখি। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে অভিবাসীদের পুনরায় ইতালিতে ফেরত পাঠানোর যে হিড়িক শুরু হয়েছে, তার বলি হচ্ছেন শত শত তরুণ। ফ্রান্স, জার্মানি, বেলজিয়াম এবং সুইজারল্যান্ডের পাশাপাশি এখন ফিনল্যান্ড, সুইডেন ও নেদারল্যান্ডসের মতো দেশগুলোও তথাকথিত ‘ডাবলিনানতি’ (Dublinanti) বা ডাবলিন চুক্তির আওতাভুক্ত অভিবাসীদের ইতালিতে ফেরত পাঠাতে শুরু করেছে। এই পরিস্থিতির এক জীবন্ত উদাহরণ ২৯ বছর বয়সী আফগান তরুণ ওয়াহিদুল্লাহ, যার সাজানো জীবন ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন অভিবাসন নীতির গ্যাঁড়াকলে পড়ে এখন লণ্ডভণ্ড।

ওয়াহিদুল্লাহর সংগ্রামের ইতিহাস

ওয়াহিদুল্লাহ একজন সাবেক আফগান পুলিশ কর্মকর্তা। ২০২১ সালে আফগানিস্তানে তালেবানের ক্ষমতা দখলের পর নিজের প্রাণ বাঁচাতে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। দীর্ঘ এবং বিপজ্জনক ‘বলকান রুট’ পাড়ি দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের অর্ধেক পথ পেরিয়ে তিনি ইতালিতে পৌঁছান। ইতালিতে প্রথম প্রবেশ করায় এখানে তার আঙুলের ছাপ এবং পরিচয় শনাক্ত করা হয়। তবে উন্নত জীবনের আশায় তিনি ইতালি ছেড়ে বেলজিয়ামে পাড়ি জমিয়েছিলেন।

বেলজিয়ামে দীর্ঘ তিন বছর সফলভাবে বসবাস করার পর এবং সেখানে আশ্রয়ের আবেদন করার পরও সম্প্রতি তার ভাগ্য বদলে যায়। ইউরোপের নতুন অভিবাসন চুক্তির কঠোর প্রয়োগের ফলে বেলজিয়াম কর্তৃপক্ষ তার আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যান করে এবং তাকে প্রথম প্রবেশের দেশ হিসেবে ইতালিতে ফেরত পাঠিয়ে দেয়। মাত্র চার দিন আগে তিনি বেলজিয়াম থেকে ইতালির উদিনে শহরে ফিরে এসেছেন।

উদিনে শহরের বর্তমান পরিস্থিতি

বর্তমানে উদিনে শহরের পুলিশ সদর দপ্তর বা কুয়েস্তুরার (Questura) সামনে শত শত অভিবাসীর দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই তরুণ আফগান নাগরিক। ওয়াহিদুল্লাহও তাদেরই একজন। তিনি জানান, তিন বছর বেলজিয়ামে থাকার পর এখন ইতালিতে ফিরে তিনি সম্পূর্ণ নিঃস্ব। ইতালির রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে তাকে। এমনকি নিয়মিত খাবার জোগাড় করাও তার জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এক বুক স্বপ্ন নিয়ে ইউরোপে আসা এই তরুণের জীবন এখন কেবলই টিকে থাকার এক ওডিসি বা দীর্ঘ যন্ত্রণাময় যাত্রায় পরিণত হয়েছে।

ডাবলিন চুক্তির প্রভাব ও আইনি জটিলতা

ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডাবলিন রেগুলেশন (Dublin Regulation) অনুযায়ী, একজন অভিবাসী ইউরোপের যে দেশে প্রথম প্রবেশ করবেন এবং যেখানে তার আঙুলের ছাপ নেওয়া হবে, সেই দেশই তার আশ্রয়ের আবেদন প্রক্রিয়াকরণ করতে বাধ্য। যদি কোনো অভিবাসী অন্য দেশে চলে যান, তবে ওই দেশ তাকে পুনরায় প্রথম প্রবেশের দেশে ফেরত পাঠাতে পারে। ইউরোপের দেশগুলো এখন এই আইনের কঠোর প্রয়োগ শুরু করায় ইতালির ওপর চাপ বহুগুণ বেড়ে গেছে।

উদিনে শহরে আসা এই অভিবাসীদের সহায়তায় কাজ করছে ‘ওসপিটি ইন আরিভো’ (Ospiti in Arrivo) নামক একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। সংগঠনটির স্ট্রিট টিম বা মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা জানিয়েছেন, প্রতিদিন নতুন নতুন অভিবাসী উদিনে পৌঁছাচ্ছেন যারা ইউরোপের অন্যান্য সমৃদ্ধ দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে ইতালিতে ফিরেছেন।

বাংলাদেশিদের জন্য এর গুরুত্ব

ওয়াহিদুল্লাহর এই করুণ কাহিনী ইতালিতে বসবাসরত বাংলাদেশি অভিবাসীদের জন্যও একটি সতর্কবার্তা। অনেক বাংলাদেশি ইতালি হয়ে ফ্রান্স, জার্মানি বা উত্তর ইউরোপের দেশগুলোতে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ইউরোপের বর্তমান কঠোর নীতির কারণে ‘ডাবলিন’ মামলার আওতায় তাদের আবার ইতালিতেই ফেরত আসতে হচ্ছে। ইতালিতে ফিরে আসার পর তাদের আবাসন ব্যবস্থা এবং নতুন করে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা অত্যন্ত কঠিন ও সময়সাপেক্ষ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

উদিনে শহরের এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন অভিবাসন চুক্তি কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি হাজার হাজার মানুষের জীবনকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ওয়াহিদুল্লাহর মতো সাবেক সরকারি কর্মকর্তারাও আজ ইউরোপের রাস্তায় দুমুঠো খাবারের জন্য হাহাকার করছেন, যা বর্তমান অভিবাসন সংকটের এক করুণ বাস্তবতাকে তুলে ধরে। স্থানীয় প্রশাসন ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো এখন আশঙ্কা করছে যে, যদি দ্রুত কোনো সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে ইতালির সীমান্ত শহরগুলোতে এই মানবিক বিপর্যয় আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।

নতুন ইউরোপীয় নিয়মে বেলজিয়াম থেকে প্রত্যাবাসিত ২৯ বছর বয়সী আফগান সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা ওয়াহিদুল্লাহ এখন ইতালির উদিনেতে; তাঁর মতো বহু ‘ডাবলিন’ অভিবাসীকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ইতালিতে ফেরত পাঠাচ্ছে।

rainews

Share This Article