ইতালির বিতর্কিত অভিবাসন চুক্তির অধীনে আলবেনিয়ার বন্দিশিবিরে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সমুদ্র থেকে উদ্ধার করে আলবেনিয়ায় পাঠানো ৭৪ জন অভিবাসীর মধ্যে ৫৫ জনই ছিলেন বাংলাদেশি নাগরিক। অবিলম্বে এই অমানবিক চুক্তি বাতিলের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
ইতালি ও আলবেনিয়ার মধ্যকার বিতর্কিত অভিবাসন চুক্তিটি অবিলম্বে বাতিলের দাবি জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। গত ২০ আগস্ট প্রকাশিত ৩৪ পৃষ্ঠার একটি বিস্তৃত প্রতিবেদনে সংস্থাটি অভিযোগ করেছে, এই চুক্তির অধীনে সমুদ্র থেকে উদ্ধার হওয়া আশ্রয়প্রার্থীদের বেআইনিভাবে আটকে রাখার পাশাপাশি তাদের পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা ও আইনি সহায়তা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এই চুক্তির আওতায় আলবেনিয়ায় পাঠানো অভিবাসীদের একটি বিশাল অংশ বাংলাদেশি হওয়ায় বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
২০২৪ সালে স্বাক্ষরিত এক চুক্তির ভিত্তিতে, ভূমধ্যসাগর থেকে ইতালীয় জাহাজে উদ্ধার হওয়া অভিবাসীদের একাংশকে সরাসরি আলবেনিয়ায় নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ইতালি। সেখানে তাদের আশ্রয় আবেদন যাচাইয়ের জন্য দুটি কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত তিনটি আলাদা অভিযানে মোট ৭৪ জনকে আন্তর্জাতিক জলসীমা থেকে আলবেনিয়ায় স্থানান্তর করে ইতালীয় কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে ৫৫ জনই ছিলেন বাংলাদেশি নাগরিক।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রথম ধাপে অক্টোবরে ইতালীয় নৌবাহিনীর জাহাজ ‘ক্যাসিওপিয়া’ (Cassiopea) ১০ জন বাংলাদেশিসহ ১৬ জনকে আলবেনিয়ায় নিয়ে যায়। নভেম্বরে ‘লিব্রা’ (Libra) জাহাজে করে নেওয়া হয় ৯ জনকে, যার মধ্যে ৭ জন বাংলাদেশি এবং ১ জন মিসরীয় ছিলেন। সবশেষ ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ‘ক্যাসিওপিয়া’ পুনরায় ৩৮ জন বাংলাদেশিসহ ৪৯ জনকে সেখানে স্থানান্তর করে। তবে পরবর্তীতে এই ৭৪ জনের মধ্যে ১২ জনকে (প্রায় ১৬ শতাংশ) অপ্রাপ্তবয়স্ক বা শারীরিকভাবে দুর্বল হিসেবে চিহ্নিত করে ইতালিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বাকিদের আটকের বিষয়টি ইতালীয় আদালত অনুমোদন না করায় এই স্থানান্তর প্রক্রিয়া আপাতত স্থগিত রয়েছে।
২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বিভিন্ন সরকারি নথি, আদালতের রায় এবং পরিদর্শকদের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে অ্যামনেস্টি তাদের প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। সংস্থাটির দাবি, উদ্ধার হওয়া মানুষদের ৫শ নটিক্যাল মাইলের বেশি দূরের আলবেনিয়ার শেনজিন (Shengjin) বন্দরে নিতে অতিরিক্ত দুই-তিন দিন সময় লাগে, যা তাদের জীবনকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়। এছাড়া, জাহাজে তড়িঘড়ি করে করা প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অনেক অপ্রাপ্তবয়স্ক ও ট্রমায় ভোগা ব্যক্তিকে সঠিকভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

আলবেনিয়ার গিয়াদেরে (Gjadër) অবস্থিত বন্দিশিবিরে আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত বলে জানিয়েছে অ্যামনেস্টি। শুনানির মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে আইনজীবীদের নিয়োগ দেওয়া হয়। আইনজীবীরা ইতালিতে বসে ভিডিও কলের মাধ্যমে আলবেনিয়ায় থাকা মক্কেলদের সাথে যুক্ত হন। একজন আইনজীবী অভিযোগ করেন, ভিডিওতে মক্কেলের শরীরের কেবল ওপরের অংশ দেখা যায়, ফলে তার ওপর কোনো শারীরিক নির্যাতন হয়েছে কি না, তা বোঝা অসম্ভব।
প্রতিবেদনে বন্দিশিবিরের পরিবেশকে অত্যন্ত কঠোর ও ‘নিরাপত্তাকেন্দ্রিক’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে হতাশায় ভুগে বন্দিদের নিজেদের আঘাত করা বা আত্মহত্যার চেষ্টার অসংখ্য প্রমাণ পেয়েছে অ্যামনেস্টি। এছাড়া, পর্যাপ্ত আইনি সুযোগ না দিয়েই আলবেনিয়া থেকে সরাসরি অভিবাসীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে, যা আন্তর্জাতিক ‘নন-রিফাউলমেন্ট’ (non-refoulement) নীতির সরাসরি লঙ্ঘন।
এসব কার্যক্রমের স্বাধীন পর্যবেক্ষণেও বাধা দিচ্ছে ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলার অজুহাতে অ্যামনেস্টির গবেষকদের গিয়াদেরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। এমনকি গত মাসে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের গ্রিন পার্টির এক প্রতিনিধিদলকেও ওই কেন্দ্রটিতে ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়।
গত জুনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন অভিবাসন চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর ইতালির দেখাদেখি অন্যান্য দেশও ইইউর বাইরে এমন আশ্রয়কেন্দ্র তৈরির আগ্রহ দেখাচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে অ্যামনেস্টি অবিলম্বে ইতালি-আলবেনিয়া চুক্তি বাতিল করে গিয়াদেরে আটকে থাকাদের ইতালিতে ফিরিয়ে নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছে। পাশাপাশি, ইউরোপের অন্য দেশগুলোকেও এমন অমানবিক মডেল অনুসরণ না করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে ইতালি–আলবেনিয়া অভিবাসন চুক্তির আওতায় স্বেচ্ছাচারী আটক, চিকিৎসা ও আইনি সহায়তার ঘাটতি এবং সম্ভাব্য বেআইনি বহিষ্কারের অভিযোগ তুলে চুক্তি বাতিলের আহ্বান জানানো হয়েছে।
infomigrants


