ইতালির স্কুলে শ্রেণিকক্ষ প্রতি বিদেশি শিক্ষার্থীর সর্বোচ্চ সীমা ৩০ শতাংশ নির্ধারণে সরকারের নতুন ডিক্রি

4 Min Read

প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির এই ঘোষণায় দেশটির ৯ লাখের বেশি অভিবাসী শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে শিক্ষা মহলে বিতর্ক শুরু হয়েছে; শিক্ষক সংগঠনগুলো নীতিগতভাবে পরিকল্পনাটির প্রশংসা করলেও মাঠপর্যায়ে এর বাস্তবায়ন নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছে।

ইতালির প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শ্রেণিকক্ষ প্রতি বিদেশি শিক্ষার্থীর উপস্থিতি সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে একটি নতুন ডিক্রি জারি করতে যাচ্ছে মেলোনি সরকার। গত ২০ সেপ্টেম্বর দলীয় যুব সংগঠন ‘জিওভেন্তু নাৎসিওনালে’-এর বার্ষিক উৎসবে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এই সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেন। তিনি জানান, আসন্ন মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকেই (CdM) এই সংক্রান্ত নির্বাহী আদেশ বা ডিক্রি অনুমোদন পাবে। এর মাধ্যমে ২০১০ সালে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী মারিয়া স্তেল্লা জেলমিনির জারি করা একটি দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয় প্রশাসনিক সার্কুলারকে পূর্ণাঙ্গ আইনি রূপ দেওয়া হচ্ছে।

প্রস্তাবিত ডিক্রির খসড়া অনুযায়ী, অভিবাসী পরিবারের সব শিক্ষার্থীই সরাসরি এই সীমার আওতায় পড়বে না। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) সদস্যভুক্ত দেশের নাগরিক এবং অভিবাসী পরিবারের দ্বিতীয় প্রজন্মের যেসকল শিক্ষার্থী ইতালীয় ভাষায় অত্যন্ত দক্ষ, তাদের এই ৩০ শতাংশ কোটা গণনার বাইরে রাখা হতে পারে। দেশটির শিক্ষামন্ত্রী জুসেপ্পে ভালদিতারা আগেই জানিয়েছিলেন, কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে বিদেশি শিক্ষার্থীদের অতিমাত্রায় ঘনত্ব এড়াতে আঞ্চলিক শিক্ষা দপ্তরগুলোর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পার্শ্ববর্তী স্কুলগুলোতে সুষম বণ্টনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। একইসঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় এলাকাভিত্তিক আবাসন ব্যবস্থার সমন্বয় করার ওপর জোর দিয়ে মন্ত্রী বলেন, নিয়মের কারণে কোনো শিক্ষার্থীকে কয়েক কিলোমিটার দূরের প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে ভোগান্তিতে ফেলা হবে না।

তবে সরকারের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নযোগ্য কি না, তা নিয়ে তীব্র সংশয় প্রকাশ করেছে দেশটির প্রধান শিক্ষকদের জাতীয় সংগঠন ‘আসোচিয়াৎসিয়নে নাৎসিওনালে প্রেসিদি’ (ANP)। সংগঠনের সভাপতি আন্তোনেল্লো জান্নেল্লি মন্তব্য করেন, শিক্ষাদানের মান ও সামাজিক সমন্বয়ের দিক থেকে শ্রেণিকক্ষে ভারসাম্য রাখার ধারণাটি ইতিবাচক হলেও বাস্তবে এটি প্রয়োগ করা প্রায় অসম্ভব। বিশেষ করে নার্সারি ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিজ আবাসের নিকটবর্তী স্কুলে ভর্তির আইনি অগ্রাধিকার রয়েছে। ফলে অভিবাসীবহুল এলাকাগুলোতে শুধুমাত্র সংখ্যার সীমা বজায় রাখার জন্য স্থানীয় পরিবারের শিশুদের ভর্তি না নেওয়া একেবারেই অবাস্তব হবে। এর আগের সার্কুলারটিও মূলত এই ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণেই পুরোপুরি কার্যকর হতে পারেনি।

অভিবাসন গবেষণা সংস্থা ‘ইদোস’ (IDOS) ও ‘ইসমু’ (ISMU)-এর সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইতালির স্কুলগুলোতে বর্তমানে প্রায় ৯ লাখ ৩১ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে যাদের ইতালীয় নাগরিকত্ব নেই, যা মোট শিক্ষার্থীর ১১ দশমিক ৬ শতাংশ। তবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য হলো, এই বিদেশি শিক্ষার্থীদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বা ৬৫ দশমিক ২ শতাংশেরই (প্রায় ৬ লাখ ৭ হাজার) জন্ম হয়েছে খোদ ইতালিতে। গত ১১ বছরে স্থানীয় ইতালীয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১২ দশমিক ৫ শতাংশ কমলেও বিদেশি শিক্ষার্থী বেড়েছে ১৬ শতাংশ, যা দেশটির তীব্র জন্মহার হ্রাসের সংকটে স্কুল ব্যবস্থার ভারসাম্য টিকিয়ে রেখেছে। জাতীয়তার ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের শীর্ষে রয়েছে রোমানিয়া, আলবেনিয়া, মরক্কো, চীন ও মিসর।

ভৌগোলিক দিক থেকে ইতালির এক-চতুর্থাংশেরও বেশি (২৬ শতাংশ বা ২ লাখ ৩৬ হাজার) বিদেশি শিক্ষার্থী রয়েছে উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশ লোম্বারদিয়ায়। একক নগর হিসেবে মিলানেই সর্বোচ্চ ৭৯ হাজার বিদেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে, যার পরেই অবস্থান রাজধানী রোমের। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সামাজিক প্রতিকূলতার কারণে বিদেশি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা মাঝপথে ছেড়ে দেওয়ার হার স্থানীয়দের চেয়ে দ্বিগুণ। এছাড়া জাতীয় মূল্যায়ন পরীক্ষা ‘ইনভালসি’র (INVALSI) ফলাফলে গণিত ও ইতালীয় ভাষায় কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও ইংরেজি ভাষার দক্ষতায় স্থানীয় ইতালীয় সহপাঠীদের চেয়েও ভালো ফলাফল করছে অভিবাসী পরিবারের সন্তানেরা।


ইতালির স্কুলগুলোতে বিদেশি নাগরিকত্বধারী শিক্ষার্থী প্রায় ৯৩১ হাজার; তাদের ৬৫.২ শতাংশ ইতালিতেই জন্মেছে। মেলোনির প্রস্তাবিত ৩০ শতাংশ কোটা বাস্তবায়নে অভিবাসীপ্রধান এলাকায় স্থানসংকট ও নৈকট্যনীতি চ্যালেঞ্জ বলে জানিয়েছেন প্রধানশিক্ষকেরা।

rainews

Share This Article