ইতালির এক ক্লাসে ২৩ শিক্ষার্থীর ২০ জনই বিদেশি: সরকারি কোটা কার্যকর হলে বন্ধের শঙ্কায় বিদ্যালয়

4 Min Read

শ্রেণিকক্ষে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ বিদেশি শিক্ষার্থী রাখার সরকারি প্রস্তাবে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে তোসকো-রোমানিয়োলো অঞ্চলের একটি পাহাড়ি স্কুল; সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা না হলে প্রতিষ্ঠানটিতে তালা ঝুলবে বলে সতর্ক করেছেন স্থানীয় মেয়র।

শ্রেণিকক্ষে বিদেশি শিক্ষার্থীদের অনুপাত সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশে সীমিত করার সরকারি পরিকল্পনায় ইতালির প্রত্যন্ত ও পাহাড়ি অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে গভীর উদ্বেগ ও প্রশাসনিক সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় এমিলিয়া-রোমানিয়া অঞ্চলের ফোরলি-চেজেনা (Forlì-Cesena) প্রদেশের ছোট্ট পাহাড়ি জনপদ ‘পরতিকো এ সান বেনেদেত্তো’ (Portico e San Benedetto)-র একমাত্র বিদ্যালয়টি এখন সরাসরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। এই বিদ্যালয়ের একটি ক্লাসে মোট ২৩ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ৩ জন ইতালীয় এবং বাকি ২০ জনই বিদেশি বংশোদ্ভূত। সরকারের প্রস্তাবিত কঠোর নীতি কার্যকর হলে স্কুলটি টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে বলে স্থানীয় প্রশাসন ও শিক্ষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

তোসকো-রোমানিয়োলো আপেন্নিনো (Appennino Tosco-Romagnolo) পর্বতমালা ঘেরা মাত্র পাঁচ শতাধিক বাসিন্দার এই গ্রামে ‘আমব্রোজো ত্রাভেরসারি’ (Ambrogio Traversari) প্রাথমিক ও শিশু বিদ্যালয়টিই এলাকার শিশুদের শিক্ষার একমাত্র ভরসা। পুরো স্কুলে কিন্ডারগার্টেন ও প্রাথমিক বিভাগ মিলিয়ে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা মাত্র ৪০ জন। এর মধ্যে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়ে পরিচালিত বিশেষ মাল্টি-গ্রেড বা সম্মিলিত শ্রেণিকক্ষে রয়েছে ২৩ জন শিক্ষার্থী। ভিন্ন ভিন্ন জাতীয়তা ও সংস্কৃতির এই ক্লাসরুমে তিনজন শিক্ষক পূর্ণকালীন (Tempo pieno) পাঠদান পরিচালনা করেন। প্রতিটি শিশুর মানসিক বিকাশ ও ব্যক্তিগত সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে এখানে এক সমন্বিত শিক্ষাদান পদ্ধতি গড়ে তোলা হয়েছে। ক্লাসে নিয়মিত ইতালীয় ছাড়াও ইংরেজি, ফরাসি এবং আরবি ভাষার স্বাভাবিক চর্চা রয়েছে।

সরকারের এমন নিয়মের বিরোধিতা করে পরতিকো এ সান বেনেদেত্তোর মেয়র মরিৎসিও মন্তি (Maurizio Monti) কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমি বিশ্বাস করতে চাই না যে প্রধানমন্ত্রী বিদ্যালয়গুলো বন্ধ করে দিতে চান। কিন্তু এই ৩০ শতাংশের কোটা সংক্রান্ত প্রস্তাব যদি আইনে পরিণত হয়, তবে আমাদের এই বিদ্যালয়টি স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না।” মেয়রের মতে, সমতল ও বড় শহরের বাস্তবতার সাথে পাহাড়ি ও প্রত্যন্ত জনপদের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্থানীয় বাস্তবতা না মেনে কোটা ব্যবস্থা চাপিয়ে দিলে গ্রামীণ জনপদের শিক্ষাব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়বে।

বিদ্যালয়ের অভিজ্ঞ শিক্ষিকা ফ্রাঞ্চেস্কা ব্রিক্কোলানি (Francesca Briccolani) জানান, আশপাশের পাহাড়ি উপত্যকার প্রায় সব পৌরসভার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে বিদেশি বংশোদ্ভূত শিক্ষার্থীদের অনুপাত অনেক বেশি। তিনি সরকারি নীতিমালার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, “কাগজে-কলমে ‘বিদেশি’ শব্দটির আসলে কোনো বাস্তব অর্থ বহন করে না। এর অর্থ কি তারা ইতালীয় ভাষা বলতে পারে না, নাকি তারা ইতালিতে জন্ম নেয়নি? আমাদের ক্লাসের অনেক শিশুই এ দেশে জন্ম নিয়ে চমৎকার ভাষায় কথা বলে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, আশির দশকের শেষভাগ থেকেই এই অঞ্চলে কার্যকরভাবে ইতালীয় ভাষা শেখানোর ব্যবস্থা চালু রয়েছে। ফলে ভাষাকে কারণ হিসেবে দেখিয়ে শিশুদের পড়াশোনায় বাধা তৈরি করা মোটেও সমীচীন নয়।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, ইতালির প্রত্যন্ত পাহাড়ি জনপদগুলোতে তীব্র জনসংখ্যা হ্রাসের কারণে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় স্কুলগুলো শিক্ষার্থী সংকটে ভুগছিল। মূলত অভিবাসী পরিবারের শিশুদের উপস্থিতির কারণেই বছরের পর বছর এই বিদ্যালয়গুলো টিকে রয়েছে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে মানবিক চাঞ্চল্য বজায় আছে। কঠোর কোটা আরোপের বদলে স্কুলগুলোতে অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগ এবং ভাষা শিক্ষার বাজেট বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। অন্যথায় বাস্তবমুখী সিদ্ধান্তের অভাবে সরকারের এই একতরফা পদক্ষেপ প্রান্তিক অঞ্চলের বহু শিশুকে মৌলিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করার ঝুঁকি তৈরি করবে।


ফোরলি-চেজেনার পোর্তিকো এ সান বেনেদেত্তোর একমাত্র স্কুলে ২৩ শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ৩ জন ইতালীয়। ৩০% বিদেশি শিক্ষার্থী কোটা কার্যকর হলে স্কুলটি বন্ধের আশঙ্কা, যদিও বহুভাষিক শিক্ষা ও একীভূতকরণ চলছে।

rainews

Share This Article