ইতালির স্কুলে প্রতি ক্লাসে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ বিদেশি শিক্ষার্থী কোটা অনুমোদন মেলোনি সরকারের

4 Min Read

শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের বিচ্ছিন্নতা ও ‘ঘেটো’ রোধে প্রথম বর্ষের ক্লাসে অভিবাসী কোটা নির্ধারণ করে ঐতিহাসিক স্কুল ডিক্রি অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা; বাস্তবায়ন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে শিক্ষক ইউনিয়ন।

ইতালির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রথম বর্ষের প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে বিদেশি বংশোদ্ভূত শিক্ষার্থীর সংখ্যা সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশে সীমাবদ্ধ করার বিতর্কিত বিধান রেখে বহুল আলোচিত নতুন স্কুল ডিক্রি অনুমোদন দিয়েছে দেশটির মন্ত্রিসভা। অভিবাসী শিক্ষার্থীদের ক্লাসরুমে যথাযথ অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে এবং তথাকথিত ‘ঘেটো’ (ghetto) সংস্কৃতি গড়ে ওঠা ঠেকাতে প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকার এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে। প্রধানমন্ত্রী মেলোনি জোর দিয়ে বলেন, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতা রোধ করতে এবং শিক্ষার মান বজায় রাখতেই এই কোটা ব্যবস্থা চালু করা জরুরি হয়ে পড়েছিল।

নতুন ডিক্রিতে নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী, পর্যাপ্ত শিক্ষাগত ভিত্তি না থাকা অ-ইতালীয় নাগরিকদের ক্ষেত্রেই এই ৩০ শতাংশের সর্বোচ্চ সীমা কার্যকর হবে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে যেসব বিদেশি নাগরিক শিশুর জন্ম ইতালিতে হয়নি কিংবা যারা অন্তত দুই বছর কিন্ডারগার্টেনে পড়েনি, তাদের এই সীমার অন্তর্ভুক্ত করা হবে। অন্যদিকে মাধ্যমিক স্তরের ক্ষেত্রে জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থায় অন্তত তিন বছর সফলভাবে উত্তীর্ণ না হওয়া বিদেশি শিক্ষার্থীরা এই কোটায় গণ্য হবে। দেশটির শিক্ষাব্যবস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইতালিতে বর্তমানে প্রায় ৩৪ হাজার শ্রেণিকক্ষে বিদেশি শিক্ষার্থীর হার ইতোমধ্যে ৩০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এ ছাড়া সরকারি মূল্যায়নে দেখা গেছে, প্রথম প্রজন্মের অভিবাসী শিক্ষার্থীরা ইতালীয় ভাষার দক্ষতায় স্থানীয় সহপাঠীদের চেয়ে গড়ে অন্তত এক বছর পিছিয়ে রয়েছে।

শিক্ষা ও মেধা বিষয়ক মন্ত্রী জিউসেপ্পে ভালদিতারা ডিক্রিটির যৌক্তিকতা তুলে ধরে জানান, জাতীয় ভাষাকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে অভিবাসীদের মূলধারার সঙ্গে একীভূত করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। অতীতে এ সংক্রান্ত মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রগুলো কেবল সুপারিশ হিসেবে থাকায় বাস্তবে মানা হতো না, তবে বর্তমান ডিক্রিটি বাধ্যতামূলক আইনি রূপ পেয়েছে। তবে যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আবাসন সংকট বা পরিবারের জরুরি প্রয়োজনে ৩০ শতাংশের সীমা বজায় রাখা সম্ভব হবে না, সেখানে বিশেষ ছাড় বা ব্যত্যয় (deroghe) দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। ভৌগোলিক ও বাস্তব কারণে কোটা পূরণ করতে না পারা স্কুলগুলোতে ইতালীয় ভাষা শিক্ষার মান বাড়াতে ১৭ দশমিক ৫ মিলিয়ন ইউরোর বিশেষ তহবিল গঠন করা হয়েছে, যা প্রাদেশিক স্কুল দপ্তরগুলোর মাধ্যমে সমন্বয় করা হবে।

অনুমোদিত এই বিস্তৃত ডিক্রিতে কোটা ছাড়াও অভিবাসী পরিবার ও স্কুলের সার্বিক পরিবেশ নিয়ে একাধিক কঠোর নির্দেশনা যুক্ত করা হয়েছে। শিক্ষার্থীর ভাষাগত ঘাটতি থাকলে অভিবাসী পরিবারগুলোর জন্য বিনামূল্যে পরিচালিত ভাষা শেখার কোর্স বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং নিয়ম না মানলে ২০০ থেকে ১ হাজার ইউরো জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। একই অঙ্কের জরিমানা রাখা হয়েছে ক্লাসরুম বা স্কুল মিটিংয়ে বোরকা, নিকাব কিংবা সুনির্দিষ্ট অসুস্থতা ছাড়া সার্জিক্যাল মাস্ক পরে মুখ ঢেকে উপস্থিত হওয়ার ক্ষেত্রেও। এ ছাড়া অসচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীদের পাঠ্যপুস্তকের সুবিধা নিশ্চিত করতে পারিবারিক আয় বা আইসিইই (ISEE)-এর সর্বোচ্চ সীমা ৩০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৪০ হাজার ইউরো নির্ধারণ এবং এ খাতে বাৎসরিক ২১ মিলিয়ন ইউরো বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সাইবার বুলিং প্রতিরোধে ৮ মিলিয়ন এবং টিউটর শিক্ষকদের সহায়তায় ৭০ মিলিয়ন ইউরো বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

এদিকে সরকারের এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছে দেশটির প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষক ইউনিয়নগুলো। শিক্ষক সমিতি ‘এফএলসি সিজিআইএল’ (FLC CGIL)-এর সাধারণ সম্পাদক জিয়ানা ফ্রাকাসি এই সিদ্ধান্তকে স্কুলের বাস্তবতার সঙ্গে সম্পূর্ণ সম্পর্কহীন ‘নিছক রাজনৈতিক প্রচারণা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধি ও চাকরির স্থায়ীকরণের মতো মৌলিক সমস্যাগুলো এড়িয়ে সস্তা জনসমর্থন পাওয়ার উদ্দেশ্যে শিক্ষাকে আদর্শিক ইস্যু বানাচ্ছে সরকার। অন্যদিকে প্রধান শিক্ষকদের সংগঠন ‘দিরিজেন্তিস্কুওলা’ (DirigentiScuola)-র সভাপতি আত্তিলিও ফ্রাত্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, চলমান শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ার পর এত বড় নীতিগত পরিবর্তন মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।


ইতালিতে স্কুলে বোরকা-নিকাব নিষিদ্ধ করে ২০০ থেকে ১০০০ ইউরো জরিমানা, অভিভাবকদের ভাষা কোর্স বাধ্যতামূলক এবং বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য শ্রেণিকক্ষে ৩০ শতাংশ সীমা নির্ধারণ করেছে সরকার।

ansa

Share This Article