ঘণ্টায় মাত্র দেড় ইউরো বেতনে অমানবিক খাটুনির শিকার প্রায় তিনশত অভিবাসীকে ৩১ মিলিয়ন ইউরোর বিশেষ প্যাকেজের আওতায় বকেয়া মজুরি ও বৈধতার সুযোগ দিচ্ছে ইতালীয় কর্তৃপক্ষ।
ইতালির মিলানে নবনির্মিত মার্কিন কনস্যুলেট ভবন তৈরির কাজে নিয়োজিত প্রায় তিনশত বিদেশি শ্রমিককে দাসত্বের মতো চরম অমানবিক পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করেছে দেশটির বিচার বিভাগ। ‘কাপোরালাতো’ বা মধ্যস্বত্বভোগী চক্রের মাধ্যমে শ্রম শোষণের শিকার এসব কর্মীর বড় একটি অংশই ভারতীয় অভিবাসী। মিলান আদালতের নির্দেশে মার্কিন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাডেল কনস্ট্রাকশন (Caddell Construction) ভুক্তভোগী কর্মীদের বকেয়া বেতন ও মানসিক ক্ষতিপূরণ বাবদ ১৯ মিলিয়ন (১ কোটি ৯০ লাখ) ইউরোরও বেশি পরিশোধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর পাশাপাশি পুলিশ প্রশাসনের বিশেষ হস্তক্ষেপে ২৩৮ জন শ্রমিককে দেশটিতে থাকার বৈধ রেসিডেন্স পারমিট (Permesso di soggiorno) প্রদান করা হয়েছে।
আদালতের নথিপত্রে আধুনিক দাসত্বের এক লোমহর্ষক চিত্র উঠে এসেছে। মিলানের পিয়াৎসালে আকুরসিওর সাবেক সামরিক শুটিং রেঞ্জ এলাকায় নতুন কনস্যুলেট ভবন নির্মাণকাজে এসব শ্রমিককে দিনে টানা ১২ ঘণ্টা খাটানো হতো। তাদের প্রতি ঘণ্টার মজুরি নির্ধারিত ছিল মাত্র ১ দশমিক ৫০ থেকে ১ দশমিক ৯১ ইউরো। তীব্র জ্বর, আঘাতপ্রাপ্ত বা হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে ফেরার পরপরই শ্রমিকদের জোর করে অবিলম্বে কাজে নামতে বাধ্য করা হতো। ভারত থেকে নিয়ে আসার পর তাদের মিলানের শহরতলির একটি আবাসন কেন্দ্রে রাখা হতো এবং সেই থাকার খরচ ও খাবারের নামে প্রতি মাসে জোরপূর্বক ৮৫০ ইউরো কেটে রাখা হতো। কর্মক্ষেত্রে নিয়মিত ভয়ভীতি প্রদর্শন, মানসিক নির্যাতন এবং দেশে ফেরত পাঠানোর অব্যাহত হুমকি দেওয়া হতো। বিচারক আঞ্জেলিকা কার্দির (Angelica Cardi) মতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং মালিকপক্ষের সুপরিকল্পিতভাবে কর্মীদের মৌলিক মানবাধিকার হরণের এক জঘন্য দৃষ্টান্ত।

এই অপরাধ তদন্তে মিলানের সরকারি কৌঁসুলি পাওলো স্তোরারির (Paolo Storari) কঠোর পদক্ষেপের পর আমেরিকান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি ক্ষতিপূরণ ও জরিমানা বাবদ মোট ৩১ মিলিয়ন ইউরো ব্যয় করতে সম্মত হয়েছে। এর মধ্যে কর্মীদের চুক্তিভিত্তিক ন্যায্য পাওনা মেটাতে ৯ দশমিক ৬ মিলিয়ন ইউরো, অন্যায়ভাবে কেটে রাখা আবাসন ও খাবারের অর্থ ফেরত বাবদ ৩ মিলিয়ন এবং অতিরিক্ত মানসিক ক্ষতিপূরণ হিসেবে আরও ৭ মিলিয়ন ইউরো সরাসরি শ্রমিকদের দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া ইতালির জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা সংস্থা ইনপস (INPS)-কে ৭ দশমিক ২ মিলিয়ন ইউরো এবং আঞ্চলিক শ্রম পরিদর্শক অধিদপ্তরকে (Ispettorato del lavoro) ৪ মিলিয়ন ইউরো জরিমানা পরিশোধ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। কাজ হারানো ৬০ জন নির্মাণ শ্রমিককে সরকারি বেকার ভাতা বা নাসপির (Naspi) সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
ইতালিতে বসবাসরত অভিবাসীদের সুরক্ষায় আইনগত দিক থেকেও এই ঘটনাকে একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত বিবেচনা করা হচ্ছে। মিলান ও পিসার পুলিশ সদর দপ্তর (Questura) ভুক্তভোগী ২৩৮ জন কর্মীকে দেশটির অভিবাসন আইনের ১৮-তের (articolo 18 ter) ধারার অধীনে বিশেষ রেসিডেন্স পারমিট প্রদান করেছে। শ্রম শোষণের শিকার ব্যক্তিদের সুরক্ষার এই পারমিটটি প্রাথমিকভাবে ১২ মাসের মেয়াদে দেওয়া হলেও পরবর্তীতে তা নবায়নযোগ্য।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক মিশন নির্মাণের কাজে যুক্ত আমেরিকান এই শীর্ষ প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, এই বিপুল অর্থ পরিশোধের অর্থ তাদের ফৌজদারি বা আইনি দায় স্বীকার করা নয়। তবে মিলান প্রসিকিউশন পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে প্রতিষ্ঠানটির এই বিপুল আর্থিক দায় গ্রহণকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেছে। এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে এর আগে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন সাইটের দুই শীর্ষ ব্যবস্থাপক—তুর্কি নাগরিক উলাস দেমির এবং ভারতীয় নাগরিক আজি আপ্পুকুট্টান। চার মাস কারাভোগের পর দেমিরের জামিনের ক্ষেত্রে প্রসিকিউশন ইতিবাচক মতামত দিয়েছে, তবে তুর্কি অংশীদার কোম্পানি এনকা (Encka) এবং অভিযুক্ত দুই কর্মকর্তার সাথে মার্কিন প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সম্পর্কের জটিল বিষয়টি এখনও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
মিলানের মার্কিন কনস্যুলেট নির্মাণকাজে শোষণের শিকার শতাধিক শ্রমিকের জন্য ১৯ মিলিয়ন ইউরোর বেশি ক্ষতিপূরণ, ২৩৮টি বিশেষ স্টে পারমিট ও ৬০টি বেকারভাতা নিশ্চিত হয়েছে; প্রতিষ্ঠানটির মোট ব্যয় প্রায় ৩১ মিলিয়ন ইউরো।
milano.corriere


