লিবিয়ায় জিম্মি ও শারীরিক নির্যাতনের মুখে জমিজমা বিক্রি করে প্রায় ২৬ লাখ টাকা খুইয়েছে চুয়াডাঙ্গার এক পরিবার; অন্যদিকে দেশে মানবপাচারের পাঁচ সহস্রাধিক মামলা বছরের পর বছর আটকে রয়েছে বিচারহীনতায়।
উন্নত জীবনের স্বপ্নে ইউরোপের উদ্দেশে পা বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্রের নির্মম শিকারে পরিণত হচ্ছে একের পর এক বাংলাদেশি পরিবার। ভিটেমাটি আর সহায়-সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হওয়াই নয়, মাসের পর মাস জিম্মিদশা, শারীরিক নির্যাতন এবং দফায় দফায় মুক্তিপণের চাপে পিষ্ট হচ্ছেন অভিবাসী ও তাদের স্বজনেরা। এত কিছুর পরও পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে কচ্ছপগতিতে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে বর্তমানে পাঁচ সহস্রাধিক মানবপাচার মামলা তদন্ত ও বিচারের দীর্ঘসূত্রতায় আটকে রয়েছে।
চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার বাসিন্দা উজ্জ্বল হোসেনের পরিবার এই ভয়ংকর অভিজ্ঞতারই এক জ্বলন্ত উদাহরণ। ২০২২ সালে ছোট ভাই মো. আরিফুল ইসলামকে ইতালি পাঠাতে স্থানীয় দালাল সেলিম রেজার সঙ্গে চুক্তি করেন উজ্জ্বল। মাসে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে সেলিম ১০ লাখ টাকা দাবি করলেও প্রাথমিক পর্যায়ে দেওয়া হয় ৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা। কিন্তু আরিফুলকে ইতালি পাঠানোর বদলে লিবিয়াপ্রবাসী সেলিম তাকে বেনগাজি হয়ে ত্রিপোলিতে নিয়ে একটি সশস্ত্র পাচারকারী চক্রের কাছে বিক্রি করে দেয়।
সেখানে একটি জানালাহীন গোপন কক্ষে আটকে রেখে আরিফুলের ওপর চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন। নির্যাতনের সেই লোমহর্ষক ভিডিও দেশে পাঠিয়ে দাবি করা হয় ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ। ভাইকে জীবিত ফেরত পেতে পৈতৃক জমি বিক্রি ও চড়া সুদে ঋণ নিয়ে চক্রটিকে ১০ লাখ টাকা দেন উজ্জ্বল।
এতেও শেষ হয়নি দুর্ভোগ। উজ্জ্বল আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিলে লিবিয়ায় এক দশক ধরে কর্মরত তাদের বাবা মো. ইজাল উদ্দিনকে পথ থেকে অপহরণ করে চক্রটি। সেখানে তাকে বেধড়ক মারধর করে ওপরের পাটির দুটি দাঁত ভেঙে ফেলা হয়। আবারও জমি বিক্রি করে আরও ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে গত বছরের ৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরে আসেন ইজাল উদ্দিন। পরবর্তীতে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি এই পাশবিক নির্যাতনের বর্ণনা দেন।
এদিকে ২০২৩ সালের শেষের দিকে অন্য একটি চক্রের মাধ্যমে আরও ৫ লাখ টাকা দিয়ে বিপজ্জনক ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে আরিফুল ইতালিতে প্রবেশ করতে পারলেও পরিবারটি এখন পুরোপুরি দেউলিয়া। সর্বমোট ২৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা খুইয়ে প্রতি মাসে মহাজন ও এনজিওর ১ থেকে দেড় লাখ টাকা ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে উজ্জ্বলদের পরিবার।

ঘটনার পর উজ্জ্বল চুয়াডাঙ্গার আদালতে সেলিম, তার স্ত্রীসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশে তদন্তে নামে সিআইডির জেলা ইউনিট। তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ফিরোজা খাতুন জানান, মূল অভিযুক্ত সেলিম রেজা, তার স্ত্রী সোনিয়া খাতুন এবং অর্থ লেনদেনে ব্যবহৃত ব্যাংক হিসাবের মালিক আলেয়া খাতুন ও আমির আলীর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র সিআইডি সদর দপ্তরে পাঠানো হলেও মূল হোতা সেলিম ও তার স্ত্রী আদালত থেকে জামিন পেয়ে মুক্ত আছেন এবং বাকি দুই আসামি এখনও পলাতক।
আরিফুলের এই চরম দুর্ভোগ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আলমডাঙ্গারই আরেক যুবক জুনায়েদ হাসান প্লাবন গত বছরের জুনে লিবিয়ার একটি বন্দিশিবিরে নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন, যেখানে তার পরিবারের ক্ষতি হয়েছিল প্রায় ৪২ লাখ টাকা।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এ বিপজ্জনক ভূমধ্যসাগর রুট দিয়ে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেছেন; যার মধ্যে শুধু ২০২৫ সালেই প্রবেশ করেছেন ২০ হাজার ২৫৯ জন। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই লিবিয়া থেকে সাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি পৌঁছেছেন ৪ হাজার ২৪৯ জন এবং গ্রিসে ৩ হাজার ৬০৮ জন। লিবিয়া থেকে ফেরত আসা প্রায় ১৫ হাজার প্রবাসীর ওপর ব্র্যাকের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৯৩ শতাংশকেই সেখানে বন্দিশিবিরে জিম্মি রাখা হয়েছিল এবং ৭৯ শতাংশ শিকার হয়েছেন নির্মম শারীরিক নির্যাতনের।
পাচারের বিস্তার ঘটলেও আইনি সুরক্ষার চিত্র চরম হতাশাজনক। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের মে পর্যন্ত ৫ হাজার ২৮৪টি মানবপাচার মামলা অনিষ্পন্ন অবস্থায় ঝুলে রয়েছে। যার মধ্যে ১ হাজার ৯৭৮টি তদন্তাধীন এবং ৩ হাজার ৩০৬টি আদালতে বিচারাধীন। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে নতুন করে ৫০১টি মামলা যুক্ত হলেও নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ১৭টির। ব্র্যাকের মতে, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির না থাকা এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রমাণের অভাবে অপরাধীরা খালাস পেয়ে যাওয়ায় পাচারকারী চক্রগুলোর তৎপরতা থামানো সম্ভব হচ্ছে না।
ইতালি পাঠানোর প্রলোভনে মানবপাচারের শিকার বাংলাদেশি পরিবারগুলো নিঃস্ব হচ্ছে; মে ২০২৬ পর্যন্ত ৫,২৮৪ মামলা অনিষ্পন্ন, অথচ প্রথম পাঁচ মাসে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ১৭টি।
bangla.thedailystar


