তেল কোম্পানিগুলোর অস্বাভাবিক মুনাফা ও করপোরেট সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সরব শ্রমিক সংগঠন ইউএসবি; এনি থেকে প্রাপ্ত রাষ্ট্রীয় লভ্যাংশ সাধারণ কর্মীদের মাঝে বণ্টনের দাবি।
ইতালিতে জ্বালানি তেলের অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষকে আর্থিক সংকটে ফেলে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর মাত্রাতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের প্রতিবাদে এক নজিরবিহীন ক্ষোভ প্রকাশ করেছে দেশটির প্রভাবশালী তৃণমূল শ্রমিক ইউনিয়ন ‘ইউএসবি’ (Unione Sindacale di Base)। রাজধানী রোমে অবস্থিত রাষ্ট্রীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান কাসা দেপোজিটি এ প্রেস্তিতি বা সিডিপি (CDP)-এর প্রধান কার্যালয়ের প্রবেশদ্বারে এক স্তূপ গোবর ও বর্জ্য ফেলে এই অভিনব বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হয়।
শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, সরকারের বেঁধে দেওয়া মূল্যসীমা কার্যকর থাকা সত্ত্বেও পেট্রোল ও ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ২ ইউরোর নিচে নামছে না, যা সাধারণ কর্মজীবী পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়কে অসহনীয় করে তুলেছে। বিক্ষোভস্থল থেকে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম রোমা-টুডেকে দেওয়া বক্তব্যে ইউএসবি-র কনফেডারেল নির্বাহী কমিটির সদস্য ও লাৎসিও অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা গুইদো লুত্রারিও জানান, জ্বালানি খরচের চরম চাপে সাধারণ মানুষ আজ দিশেহারা। অথচ জ্বালানি কোম্পানি ও রাষ্ট্র এই গণদুর্দশাকে পুঁজি করে বৈধ পন্থায় বিপুল অঙ্কের মুনাফা লুটছে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, জনজীবনকে বিপন্ন করে যে প্রতিষ্ঠানগুলো মুনাফার পাহাড় গড়ছে, তাদের কাছে সাধারণ মানুষের দুর্দশার তীব্র প্রতীকী বার্তা পৌঁছে দিতেই এই বর্জ্য নিক্ষেপ করা হয়েছে।
প্রতিবাদের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইতালির বহুজাতিক তেল ও গ্যাস জায়ান্ট ‘এনি’ (ENI)-এর আকাশচুম্বী আয় এবং তাতে সরকারের প্রত্যক্ষ অংশীদারিত্ব। ইউনিয়নের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক যুদ্ধ সংঘাতের সুযোগ নিয়ে তেলের চড়া দামের কারণে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই এনি ৩ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ইউরো নিট মুনাফা অর্জন করেছে, যা পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৩ শতাংশ বেশি। একইসঙ্গে বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটির আয় আরও বৃদ্ধির ইতিবাচক পূর্বাভাস রয়েছে। এ নিয়ে বিগত পাঁচ বছরে প্রতিষ্ঠানটির পুঞ্জীভূত নিট মুনাফা রেকর্ড ২৯ দশমিক ৭ বিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছেছে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তেল কোম্পানি এনি-তে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ সংস্থা সিডিপির অংশীদারিত্ব রয়েছে ৩০ দশমিক ৯২ শতাংশ এবং ইতালির অর্থ মন্ত্রণালয়ের সরাসরি মালিকানা রয়েছে ২ দশমিক ১৬ শতাংশ। ফলে জ্বালানি মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের বাস্তব মজুরি ও ক্রয়ক্ষমতা নিঃশেষ করে দিলেও রাষ্ট্র স্বয়ং এই পরিস্থিতি থেকে বিপুল পরিমাণ লভ্যাংশ ও রাজস্ব আয় করছে।
সরকার ঘোষিত জ্বালানির মূল্যসীমা নির্ধারণের পদক্ষেপকেও একটি লোকদেখানো প্রচারণা বলে কঠোর সমালোচনা করেছেন শ্রমিক প্রতিনিধিরা। লুত্রারিও উল্লেখ করেন, এই নীতি মূলত কোনো স্থায়ী স্বস্তি আনেনি। বরং বিগত বছরে যেখানে প্রতি লিটার তেলের দাম ছিল ১ দশমিক ৭০ ইউরো, সেখানে নতুন নীতিমালার অজুহাতে ২ ইউরোর অস্বাভাবিক উচ্চমূল্যকেই স্থায়ী ও বৈধ রূপ দেওয়া হয়েছে। এর বিরূপ প্রভাবে ছোট জ্বালানি বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং কৃত্রিমভাবে বাজারে বাড়তি দাম চেপে বসেছে।
বিদ্যমান অর্থনৈতিক সংকট নিরসনে কোনো ধরনের সাময়িক আশ্বাসের বদলে স্থায়ী ও কাঠামোগত পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছে ইউএসবি। ইউনিয়নটির পক্ষ থেকে প্রস্তাব করা হয়, তেল জায়ান্ট এনি থেকে রাষ্ট্রীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান সিডিপি এবং অর্থ মন্ত্রণালয় যে বিপুল পরিমাণ মুনাফার লভ্যাংশ পেয়েছে, তা সরকারি কোষাগারে জমিয়ে রাখা অনুচিত। বরং এই অর্থ অবিলম্বে পরিবহন খাতের কর্মী, ডেলিভারি শ্রমিক, গাড়ি ব্যবহারকারী সাধারণ কর্মচারী এবং প্রবাসী পরিবারগুলোর সহায়তায় সরাসরি পুনর্বণ্টন করা প্রয়োজন। এমন বাস্তবমুখী পদক্ষেপের মাধ্যমেই কেবল ক্ষতিগ্রস্ত নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষকে লাগামহীন মূল্যস্ফীতির হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব।
জ্বালানি মূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে রোমে Cassa Depositi e Prestiti-এর কার্যালয়ের সামনে ইউএসবি ইউনিয়ন প্রতীকীভাবে গোবর ফেলে, রাষ্ট্রীয় জ্বালানি আয়ের বণ্টন নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
romatoday


