যুদ্ধ শুরুর চার বছরের বেশি সময় পর ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাস্তুচ্যুত ইউক্রেনীয়দের উপস্থিতি স্থায়ী কাঠামোগত রূপ নিয়েছে; নতুন সিদ্ধান্তে সুরক্ষার মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হলেও যুক্ত করা হয়েছে সামরিক বিধিমালার নতুন শর্ত।
রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের কারণে দেশ ছেড়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বিভিন্ন রাষ্ট্রে অস্থায়ী সুরক্ষায় বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা ৪৪ লাখ ৩০ হাজারে গিয়ে ঠেকেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের (Eurostat) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, গত জুলাইয়ের শেষ নাগাদ এই বিপুল সংখ্যক মানুষ সুরক্ষার সুবিধা ভোগ করছিলেন। জুন মাসের তুলনায় এই সংখ্যা নতুন করে আরও ১৯ হাজার ৯৪৫ জন বা শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। তুলনামূলকভাবে এই বৃদ্ধির গতি কিছুটা ধীর হলেও সাম্প্রতিক দশকগুলোতে ইউরোপ মহাদেশের মুখোমুখি হওয়া অন্যতম বৃহত্তম বাস্তুচ্যুতির নজির হিসেবে একে চিহ্নিত করছে সংস্থাটি।
প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, ইউরোপের দেশগুলোতে সুরক্ষাপ্রাপ্তদের অবস্থানের ক্ষেত্রে ব্যাপক বৈষম্য রয়েছে। মোট সুবিধাভোগীর প্রায় ৬০ শতাংশই অবস্থান করছেন মাত্র তিনটি দেশে। আশ্রয়দাতাদের তালিকায় এককভাবে শীর্ষে রয়েছে জার্মানি; দেশটিতে ১২ লাখ ৯০ হাজার ২২৫ জন ইউক্রেনীয় রয়েছেন, যা পুরো ইউরোপীয় ইউনিয়নের মোট সুরক্ষাপ্রাপ্তদের ২৯ দশমিক ১ শতাংশ। এরপর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে পোল্যান্ড (৯ লাখ ৫৩ হাজার ৬০ জন বা ২১.৫ শতাংশ) এবং তৃতীয় স্থানে চেক প্রজাতন্ত্র (৩ লাখ ৯৫ হাজার ২২৫ জন বা ৮.৯ শতাংশ)।
বিপরীতে ইতালিতে এই চিত্র অনেকটাই ভিন্ন। গত ৩১ জুলাই পর্যন্ত দেশটিতে সুরক্ষাপ্রাপ্ত ইউক্রেনীয়র সংখ্যা ছিল ৫৩ হাজার ৯৭৫, যা মোট সংখ্যার মাত্র ১ দশমিক ২ শতাংশ। জনসংখ্যার অনুপাতেও ইতালিতে আশ্রিতের হার অত্যন্ত কম; দেশটিতে প্রতি এক হাজার স্থানীয় বাসিন্দার বিপরীতে সুরক্ষাপ্রাপ্ত ইউক্রেনীয়র সংখ্যা আড়াই জনেরও নিচে। অথচ ইউরোপীয় ইউনিয়ন জুড়ে এই গড় হার প্রতি হাজারে ৯ দশমিক ৮ জন।
তবে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে জনসংখ্যার অনুপাতে আশ্রিতের ঘনত্ব অনেক বেশি। মোট জনসংখ্যার তুলনায় সুরক্ষাপ্রাপ্তদের সংখ্যায় শীর্ষে রয়েছে চেক প্রজাতন্ত্র; সেখানে প্রতি এক হাজার বাসিন্দার বিপরীতে ৩৬ দশমিক ২ জন সুবিধাভোগী বসবাস করছেন। এরপর স্লোভাকিয়ায় প্রতি হাজারে ২৭ দশমিক ৫ জন এবং সাইপ্রাসে ২৬ দশমিক ৭ জন আশ্রিত রয়েছেন। ইউরোস্ট্যাটের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২৬টি সদস্য দেশের মধ্যে ২৩টিতেই জুন থেকে জুলাইয়ের মধ্যে সুবিধাভোগীর সংখ্যা বেড়েছে। সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বড় বৃদ্ধি দেখা গেছে চেক প্রজাতন্ত্রে (নতুন করে ৪,৪১৫ জন), রোমানিয়ায় (৪,০৫৫ জন) এবং জার্মানিতে (৩,৯৯৫ জন)। বিপরীতে পোল্যান্ডে ৮ হাজার ১১০ জন, ফ্রান্সে ৪৭৫ জন এবং সাইপ্রাসে ১১০ জন সুবিধাভোগী কমেছে। তবে ইউরোস্ট্যাট জানিয়েছে, সুবিধাভোগীদের তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার নিয়ম প্রতিটি দেশে এক রকম না হওয়ায় পরিসংখ্যানে এই মাসিক হ্রাস-বৃদ্ধি দেখা যেতে পারে।

জনসংখ্যার বিন্যাস বিশ্লেষণে দেখা যায়, সুবিধাভোগীদের ৯৮ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি ইউক্রেনের নাগরিক। তাদের একটি বড় অংশই নারী ও শিশু। মোট সুরক্ষাপ্রাপ্তদের ৪৩ দশমিক ৪ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নারী, ২৭ দশমিক ১ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ এবং প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বা ২৯ দশমিক ৪ শতাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু।
২০২২ সালের মার্চে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পরপরই ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই বিশেষ ‘অস্থায়ী সুরক্ষা ব্যবস্থা’ কার্যকর করে। দীর্ঘ ও জটিল ব্যক্তিগত রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদনের পথ এড়িয়ে তাৎক্ষণিকভাবে গণসুরক্ষা দিতেই এই আইনি কাঠামো নেওয়া হয়েছিল। এর মাধ্যমে দেশগুলোতে বসবাসের বৈধ অধিকার, কাজের সুযোগ, আবাসন, চিকিৎসা, সামাজিক সহায়তা এবং শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা হয়।
সম্প্রতি গত ১৫ জুলাই ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো এই বিশেষ সুরক্ষার মেয়াদ এক বছর বাড়িয়ে ২০২৮ সালের ৪ মার্চ পর্যন্ত বহাল রাখার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে। তবে নতুন এই দফায় সুরক্ষার ক্ষেত্রে সুবিধাভোগীদের নিজ দেশ ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ সামরিক দায়িত্ব বা বাধ্যবাধকতা মেনে চলার বিষয়ে শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। ইউরোপীয় কাউন্সিলের মতে, বাস্তুচ্যুতদের সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি ইউক্রেনের নিজস্ব প্রতিরক্ষার প্রয়োজনীয়তার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতেই এই সিদ্ধান্ত। চার বছরের বেশি সময় পর এই পদক্ষেপ নিশ্চিত করে যে, সমস্যাটি এখন আর কেবল জরুরি ত্রাণ তৎপরতায় সীমাবদ্ধ নেই; বরং ইউরোপের দেশগুলোর জন্য এখন কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করাই প্রধান দায়িত্ব হয়ে উঠেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নে অস্থায়ী সুরক্ষায় আছেন ৪৪ লাখেরও বেশি ইউক্রেনীয় শরণার্থী; জার্মানি, পোল্যান্ড ও চেকিয়ায় রয়েছেন প্রায় ৬০ শতাংশ, ইতালিতে ৫৪ হাজার। সুরক্ষা ২০২৮ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এটি ইউরোপের দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতা।
stranieriinitalia


