২০২৫ সালে প্রত্যাবাসন কেন্দ্রগুলোতে রেকর্ডসংখ্যক অভিবাসীকে আটক রাখা হলেও তাঁদের মাত্র এক-চতুর্থাংশকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়েছে; সরকারি অভিবাসন নীতি ও বন্দিশিবিরের উপযোগিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিবেদন।
ইতালির অভিবাসী প্রত্যাবাসন কেন্দ্র বা ‘সিপিআর’ (Centri di permanenza per il rimpatrio)-এর কার্যকারিতা ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা অ্যাকশনএইড ইতালি। ইউনিভার্সিটি অব বারি আলদো মোরোর রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহায়তায় সংস্থাটির তৈরি করা ‘বহিষ্কার: ইতালির প্রত্যাবাসন নীতির ব্যবচ্ছেদ ২০১৫-২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। রোমে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বন্দিশিবিরগুলোতে অভিবাসী আটকের সংখ্যা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যয় আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেলেও সেখান থেকে প্রত্যাবাসনের হার নেমে এসেছে মাত্র ২৫ দশমিক ৩ শতাংশে।
সরকারি তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা এই গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে ইতালি মোট ৪ হাজার ৭৮৪ জন অভিবাসীকে জোরপূর্বক নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়েছে। তবে এদের মধ্যে মাত্র ১ হাজার ৭৩২ জন অভিবাসী বিভিন্ন সিপিআরে বন্দি ছিলেন। অবশিষ্ট ৩ হাজার ৫২ জনকে কোনো ধরনের বন্দিশিবিরে আটক না রেখেই সরাসরি বহিষ্কার করা হয়েছে। অথচ একই বছর দেশটির ১১টি চালু বন্দিশিবিরে রেকর্ডসংখ্যক ৬ হাজার ৮৩৫ জন অভিবাসীকে প্রবেশ করানো হয়েছিল।
প্রতিবেদনে ২০২২ সালের সঙ্গে ২০২৫ সালের পরিস্থিতির তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়। ২০২২ সালে ইতালিতে ১০টি সক্রিয় কেন্দ্রে ৬ হাজার ৪৫৭ জন অভিবাসীকে আটক রেখে ৩ হাজার ১৫৪ জনকে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু ২০২৫ সালে একটি কেন্দ্র বৃদ্ধির পাশাপাশি মোট বন্দির সংখ্যা বাড়লেও কেন্দ্রগুলো থেকে প্রত্যাবাসনের সংখ্যা প্রায় ৪৫ দশমিক ১ শতাংশ হ্রাস পায়। বিপরীতে, বন্দিশিবিরের বাইরে থেকে সরাসরি বিতাড়নের হার ৭৬২ থেকে বেড়ে ৩ হাজার ৫২ জনে দাঁড়ায়। গবেষকদের মতে, এই তথ্য স্পষ্ট করে যে অভিবাসীদের বন্দিশিবিরে আটকে রাখা প্রত্যাবাসন বাস্তবায়নের কার্যকর উপায় হয়ে উঠতে পারছে না।

এদিকে প্রত্যাবাসন বিলম্বিত হওয়ায় আটকাদেশের গড় সময়ও প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত একটি প্রত্যাবাসন কার্যকর করতে গড়ে যেখানে ৬২ থেকে ৮৪ দিন আটক রাখার প্রয়োজন হতো, ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪৮ দিনে। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ইতালির দ্বিপাক্ষিক প্রত্যাবাসন চুক্তি না থাকা সত্ত্বেও ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দুই হাজারের বেশি অভিবাসীকে কোনো বাস্তব সম্ভাবনা ছাড়াই দীর্ঘদিন আটকে রাখা হয়েছিল। এ বিষয়ে অ্যাকশনএইডের অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ফাব্রিজিও কোরেসি প্রশ্ন তোলেন, ‘সিপিআরের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী?’ তাঁর মতে, আটকক্ষমতা বাড়ানো মানেই কেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে অধিকসংখ্যক মানুষকে ফেরত পাঠানো নয়।
মানবিক দিক ছাড়াও এই ব্যবস্থার আর্থিক বোঝা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ২০১৮ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সিপিআর এবং সীমান্ত প্রক্রিয়ার আওতায় থাকা আশ্রয়প্রার্থীদের আটক কেন্দ্র ‘সিতরা’ (Ctra) পরিচালনায় দেশটির ব্যয় হয়েছে অন্তত ২১ কোটি ৭১ লাখ ইউরো। এর মধ্যে শেষ তিন বছরেই (২০২৩-২০২৫) ব্যয় হয়েছে মোট খরচের ৬৬ দশমিক ২ শতাংশ। ফলে কেন্দ্র থেকে প্রতিজন অভিবাসীকে ফেরত পাঠাতে রাষ্ট্রের খরচ ২০২৩ সালের ৬ হাজার ৪৫৫ ইউরো থেকে ১৫৬ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ৫৬০ ইউরোতে।
এক দশকের সামগ্রিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ইতালিতে প্রায় ৩ লাখ ২ হাজার বহিষ্কারাদেশ জারি হলেও স্বেচ্ছায় ও জোরপূর্বক মিলিয়ে কার্যকর হয়েছে মাত্র ৬৬ হাজার। সংস্থাটি স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, ইতালির আইনানুযায়ী প্রশাসনিক আটক একটি ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা, যা কেবল প্রত্যাবাসনের বাস্তব সুযোগ থাকলেই প্রয়োগ করার নিয়ম। বিপুল অর্থ অপচয় ও কার্যকারিতা হ্রাসের এই পরিসংখ্যান ইতালির বর্তমান অভিবাসন কৌশলকে নতুন বিতর্কের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
২০২৫ সালে ইতালির CPR-এ ৬,৮৩৫ জন প্রবেশ করলেও সেখান থেকে মাত্র ১,৭৩২ জনকে ফেরত পাঠানো হয়েছে; আটকব্যবস্থায় ব্যয় হয়েছে অন্তত ২১৭.১ মিলিয়ন ইউরো।
stranieriinitalia


