দেশজুড়ে ভাড়াটেদের বিক্ষোভ এবং সংসদে আইন পাসের ব্যর্থতায় তিন বছর আগেই স্পেনে ২৯ নভেম্বর সাধারণ নির্বাচনের ডাক দিলেন প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ।
স্পেনের রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের নাটকীয় মোড় নিয়ে নির্ধারিত মেয়াদের প্রায় তিন বছর আগেই দেশটিতে আগাম সাধারণ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। সোমবার রাজধানী মাদ্রিদ থেকে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক টেলিভিশন ভাষণে পেদ্রো সানচেজ জানান, আগামী ২৯ নভেম্বর স্পেনজুড়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। দেশটির নিয়ম অনুযায়ী ২০২৭ সালের গ্রীষ্মকালে এই ভোট হওয়ার কথা থাকলেও বহুমুখী অভ্যন্তরীণ সংকটের মুখে পেদ্রো সানচেজ তাঁর মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই জনগণের নতুন ম্যান্ডেট নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া তীব্র আবাসন সংকট এবং আইনসভায় তাঁর প্রশাসনের বড় ধরনের নীতিগত পরাজয়। সম্প্রতি মাদ্রিদে অতিরিক্ত বাড়িভাড়া বৃদ্ধির দায়ে ৮৭ বছর বয়সী এক বয়োজ্যেষ্ঠ নারীকে উচ্ছেদ করা হলে স্পেনজুড়ে ভাড়াটেদের অধিকার নিয়ে তীব্র গণবিক্ষোভ শুরু হয়। জনসাধারণের অসন্তোষ সামাল দিতে এবং ভাড়াটেদের অধিকার রক্ষায় পেদ্রো সানচেজের সংখ্যালঘু বামপন্থী জোট সরকার পার্লামেন্টে দুটি জরুরি ডিক্রি জারির উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে গত শুক্রবার আইনসভায় ভোটাভুটিতে পেদ্রো সানচেজের সেই প্রস্তাবিত আইন দুটি চূড়ান্তভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার কিছু জরুরি প্রশাসনিক পদক্ষেপ অনুমোদনের পরিকল্পনা থাকলেও আইনসভায় পেদ্রো সানচেজ প্রশাসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতার অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
টেলিভিশন ভাষণে পেদ্রো সানচেজ সাফ জানান, সংস্কারমূলক কার্যক্রম সফল করতে পার্লামেন্টে তাঁর একটি ‘বৃহত্তর প্রগতিশীল সংখ্যাগরিষ্ঠতা’ প্রয়োজন, যা তথাকথিত অভিজাত শ্রেণির প্রতিরোধ ভেঙে নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে। অতীতে নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে পেদ্রো সানচেজ অকপটে বলেন, তাঁর সরকারের কার্যকালে কিছু ভুলত্রুটি হয়েছে এবং নির্ধারিত সব লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হয়নি। পেদ্রো সানচেজ আরও উল্লেখ করেন, অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস, নাগরিক সেবার মানোন্নয়ন এবং সাধারণ মানুষের জন্য সুলভ আবাসন নিশ্চিত করার মতো জটিল সমস্যাগুলো সমাধানের স্বার্থেই নতুন রাজনৈতিক শক্তির প্রয়োজন।

কেবল আবাসন নিয়ে বিরোধই নয়, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ পেদ্রো সানচেজের নেতৃত্বাধীন সরকারের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। সরকারের সাবেক কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার পাশাপাশি খোদ পেদ্রো সানচেজের স্ত্রী ও ভাইয়ের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের বিচার বিভাগীয় তদন্ত চলমান রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি এবং অভিবাসন সংকট। পেদ্রো সানচেজের ক্ষমতাসীন সমাজতান্ত্রিক দল (PSOE) এবং তাদের জোটসঙ্গী ‘সুমার’ (Sumar) আইনসভায় সংখ্যালঘু হওয়ায় যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস করতে পেদ্রো সানচেজকে চরম বেগ পেতে হচ্ছিল।
পেদ্রো সানচেজের আগাম ভোটের ঘোষণায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। রক্ষণশীল প্রধান বিরোধী দল পিপলস পার্টির শীর্ষ নেতা আলবার্তো নুনিয়েস ফেইহো সানচেজের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে দাবি করেছেন, এই নির্বাচনের মাধ্যমে স্পেনবাসী অবশেষে তাদের দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ ও প্রকৃত মতামত প্রকাশের সুযোগ পাবে। কট্টর ডানপন্থী দল ‘ভক্স’-এর নেতা সান্তিয়াগো আবাসকালও পেদ্রো সানচেজের পদক্ষেপে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। অপরদিকে পেদ্রো সানচেজের মন্ত্রিসভার সদস্য ও আঞ্চলিক নেতারা আশা প্রকাশ করেছেন যে, সব প্রতিকূলতা জয় করে পেদ্রো সানচেজ নাটকীয়ভাবে বিজয়ী হয়ে সরকারে প্রত্যাবর্তন করবেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গত ১১ বছরের মধ্যে এটি হতে চলেছে পেদ্রো সানচেজের ষষ্ঠ সাধারণ নির্বাচন। বিভিন্ন সাম্প্রতিক জনমত জরিপের আভাস অনুযায়ী, নির্বাচনে রক্ষণশীল পিপলস পার্টি সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে এবং একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে তারা কট্টর ডানপন্থী দল ভক্সের সাহায্য নিতে পারে। ফলে তীব্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের মুখে পেদ্রো সানচেজ ক্ষমতা ধরে রাখতে পারবেন কি না, তা নির্ধারণে আগামী ২৯ নভেম্বরের নির্বাচন তাঁর জন্য এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা হতে চলেছে।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ২৯ নভেম্বর আগাম জাতীয় নির্বাচন ঘোষণা করেছেন; আবাসন সংকট ও ভাড়াটিয়া সুরক্ষা নিয়ে দেশজুড়ে বিক্ষোভের মধ্যেই ভোট এগিয়ে আনা হলো।
bbc


