ইতালির জাতীয় গড়ের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি হারে শতায়ু হচ্ছেন বোলোতানার নারীরা; বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই প্রত্যন্ত জনপদেই গড়ে উঠেছে বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘজীবী নারী সমাজ।
ইতালির সার্দিনিয়া দ্বীপের ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম বোলোতানার বাসিন্দাদের, বিশেষ করে নারীদের অস্বাভাবিক দীর্ঘ জীবনকাল নিয়ে নতুন চমকপ্রদ তথ্য প্রকাশ করেছেন গবেষকেরা। সাম্প্রতিক এক বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এই প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীদের শতবর্ষ পূর্ণ করার সম্ভাবনা সাধারণ হিসাবের চেয়ে বহু গুণ বেশি। স্বাস্থ্য ও বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ফ্রন্টিয়ার্স ইন এজিং-এ প্রকাশিত গবেষণার বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সায়েন্স অ্যালার্ট জানিয়েছে, বোলোতানাকে দীর্ঘজীবীদের বিশ্বমঞ্চে সম্ভাব্য এক নতুন ‘ব্লু জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। প্রায় দুই দশক আগে সার্দিনিয়াতেই আবিষ্কৃত হয়েছিল বিশ্বের প্রথম ‘ব্লু জোন’, যেখান থেকে বর্তমান বোলোতানা গ্রামের দূরত্ব মাত্র ১১০ কিলোমিটার।
২০২১ থেকে ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, বোলোতানা গ্রামে বসবাসকারী ৭০ বছর বয়সী একজন নারীর গড়ে আরও ২০ বছর ৮৫ দিন বেঁচে থাকার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। পুরো ইতালির ক্ষেত্রে এই বাড়তি আয়ুর জাতীয় গড় ১৮ বছর ৬ দিন। সবচেয়ে নজরকাড়া বিষয় হলো, এই জনপদের ৭০ বছর বয়সী নারীদের শতবর্ষ ছোঁয়ার সম্ভাবনা দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৮৩ শতাংশে। অথচ ইতালির জাতীয় পর্যায়ে এই হার মাত্র ৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের নারীদের চেয়ে বোলোতানার নারীদের শতায়ু হওয়ার সম্ভাবনা তিন গুণেরও বেশি। গবেষণার সহলেখক ও যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় শিকাগোর মহামারি বিশেষজ্ঞ এস. জে ওলশানস্কি জানান, তাঁদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী এটি সম্ভবত বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘজীবী নারী জনগোষ্ঠীর একটি অনন্য নজির।

নারীদের পাশাপাশি বোলোতানার পুরুষদের মধ্যেও দীর্ঘ আয়ু পাওয়ার স্পষ্ট প্রবণতা রয়েছে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ৭০ বছর বয়সী একজন পুরুষের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত আরও ১৬ বছর ২ দিন বাঁচার সম্ভাবনা রয়েছে এবং তাদের শতবর্ষ পার করার হার প্রায় ৪ দশমিক ৯২ শতাংশ, যেখানে ইতালির জাতীয় গড় মাত্র ১ দশমিক ৪১ শতাংশ। গবেষণা চলাকালে গ্রামটিতে মোট জনসংখ্যা ছিল মাত্র ২ হাজার ২৬৬ জন। গবেষকরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, নির্দিষ্ট সময়ের তথ্য ব্যবহারের কারণে পরিসংখ্যানে তারতম্য দেখা যেতে পারে। যেমন ২০১৫ থেকে ২০১৯ সালের হিসাবে নারীদের শতায়ু হওয়ার সম্ভাবনা ছিল ১ দশমিক ৪৬ শতাংশ। তবে তথ্যের নির্ভুলতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই, কারণ বোলোতানায় কয়েক শতাব্দী ধরে স্থানীয় প্রশাসন ও গির্জায় জন্ম-মৃত্যুর নথি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সংরক্ষিত রয়েছে। প্রতিটি শতবর্ষী ব্যক্তির প্রকৃত বয়স নিশ্চিত করার পরই গবেষকেরা এই তথ্য নথিভুক্ত করেছেন।
বোলোতানার নারীদের এমন দীর্ঘ জীবনের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো সম্পূর্ণ উন্মোচিত হয়নি। তবে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, বংশগত জিনগত বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি পাহাড়ি পরিবেশ, কায়িক পরিশ্রম, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত রাসায়নিকমুক্ত খাদ্য এবং নিবিড় পারিবারিক বন্ধন এর পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে। এই পাহাড়ি এলাকায় দৈনন্দিন কাজে গাড়ির বদলে মানুষ সাধারণত হেঁটে চলাফেরা করেন। গবেষক ওলশানস্কির মতে, গ্রামবাসীরা পারস্পরিক নিবিড় যোগাযোগ রক্ষা করে মিলেমিশে বাস করেন, যা তাদের মানসিক চাপমুক্ত রাখতে সাহায্য করে।
দীর্ঘায়ু ও সুস্থ জীবন নিয়ে কাজ করা সংস্থা ‘ব্লু জোনস ইনকর্পোরেটেড’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও গবেষণার সহলেখক ড্যান বুয়েটনার বলেন, এই গবেষণায় বোলোতানা থেকে অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক তথ্য পাওয়া গেছে। বিজ্ঞানীদের পরবর্তী লক্ষ্য হলো এই বিস্ময়কর দীর্ঘায়ুর অন্তর্নিহিত কারণগুলো বিশদভাবে উন্মোচন করা, যাতে এখানকার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তের মানুষকেও আরও বেশি দিন সুস্থ ও কর্মক্ষম জীবনযাপনে সহায়তা করা যায়।
thedailystar
সার্দিনিয়ার বোলোতানায় ৭০ বছর বয়সী নারীদের শতবর্ষে পৌঁছানোর সম্ভাবনা ১৩.৮৩ শতাংশ, যা ইতালির জাতীয় গড় ৩.৫৪ শতাংশের প্রায় চার গুণ; দীর্ঘায়ুর রহস্য খুঁজছেন গবেষকেরা।


