মিলানে জন্মের পরই গাছতলায় ফেলে যাওয়া শিশু, কান্না শুনে পথচারীর উদ্ধার

4 Min Read

মিলানের উপকণ্ঠে ব্যাগে ভরে নির্জন গাছের নিচে ফেলে যাওয়া এক নবজাতককে নাটকীয়ভাবে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে; শিশুটির সুরক্ষার পূর্ণ দায়িত্ব নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ঘটনাটিকে চরম হৃদয়বিদারক আখ্যা দিয়েছেন স্থানীয় মেয়র।

ইতালির উত্তরাঞ্চলীয় শহর মিলানের উপকণ্ঠে পৃথিবীর আলো দেখার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মাথায় এক নবজাতককে চরম অমানবিকতার শিকার হতে হয়েছে। একটি কাপড়ের শপিং ব্যাগে মুড়িয়ে নির্জন গাছের নিচে ফেলে রেখে যাওয়া হয়েছিল সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুটিকে। তবে ভাগ্যক্রমে এক পথচারী নারীর সময়োচিত সাহসিকতায় মৃত্যুর মুখ থেকে অলৌকিকভাবে রক্ষা পেয়েছে ফুটফুটে শিশুটি। বর্তমানে সে আশঙ্কামুক্ত অবস্থায় মিলানের একটি হাসপাতালে চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছে। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে যেমন গভীর ক্ষোভ ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে, তেমনি পৌর প্রশাসন শিশুটির অভিভাবকত্ব ও সার্বিক দায়িত্ব নেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মিলানের সীমান্তবর্তী প্রায় ৭৫ হাজার বাসিন্দার পৌর এলাকা সিনিসেলো বালসামোর ভিয়া মন্তে ওরতিগারা (Via Monte Ortigara) নামক সড়কে ঘটনাটি ঘটে। বিকেল চারটার দিকে নিজের পোষা কুকুর নিয়ে নিয়মিত সান্ধ্যকালীন হাঁটায় বের হয়েছিলেন এক স্থানীয় নারী। হঠাৎ রাস্তার পাশে একটি গাছের নিচে পড়ে থাকা নীল রঙের একটি বড় ব্যাগের ভেতর কাপড়ে মৃদু নড়াচড়া প্রত্যক্ষ করেন তিনি। কৌতূহল ও উদ্বেগে কাছে গিয়ে তিনি ভেতর থেকে সদ্যোজাত শিশুর অস্পষ্ট কান্নার আওয়াজ শুনতে পান। পরিস্থিতি অনুধাবন করে তিনি অবিলম্বে আরেকজন পথচারীকে ডেকে আনেন এবং ব্যাগটি খুলে দেখেন। রক্তমাখা কাপড় ও টি-শার্টের স্তূপে জড়ানো অবস্থায় কাঁপতে থাকা শিশুটিকে দেখে তিনি কালবিলম্ব না করে নিজের পরনের জ্যাকেট খুলে তাকে উষ্ণ রাখেন এবং জরুরি সেবা নম্বরে (১১২) ফোন করে সাহায্য চান।

জরুরি উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রাথমিক সুরক্ষার পর শিশুটিকে দ্রুত মিলানের খ্যাতনামা নিগুয়ার্দা (Niguarda) হাসপাতালে নিয়ে যায়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, প্রায় চার কেজি ওজনের শিশুটি হাসপাতালে পৌঁছানোর সময় কিছুটা হাইপোথার্মিয়া বা অতিরিক্ত ঠাণ্ডাজনিত সমস্যায় ভুগলেও নিবিড় পরিচর্যার পর এখন পুরোপুরি আশঙ্কামুক্ত রয়েছে। পরীক্ষার পর চিকিৎসকদের ধারণা, উদ্ধারের মাত্র দুই ঘণ্টা আগে শিশুটির জন্ম হয়েছিল।

ঘটনাটিকে অত্যন্ত বেদনাদায়ক আখ্যা দিয়ে গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সিনিসেলো বালসামোর মেয়র জিয়াকোমো গিলার্দি। তিনি জানান, সদ্য জন্ম নেওয়া একটি শিশুকে এমন অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে রেখে যাওয়া সম্পূর্ণ অকল্পনীয় ও অমানবিক। তবে এই শিশু এখন কেবল কোনো নির্দিষ্ট পরিবারের নয়, বরং ‘পুরো শহরের সন্তান’। পৌর প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিশুটির শারীরিক সুস্থতা, আইনি নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের সার্বিক সুরক্ষার যাবতীয় দায়িত্ব নেওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার করেন তিনি। একই সাথে তিনি উদ্ধারকারী নারীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, তার মানবিক তৎপরতা না থাকলে শিশুটির জীবন বাঁচানো হয়তো অসম্ভব হতো।

মেয়র আরও মন্তব্য করেন, সিনিসেলো বালসামো হয়তো অর্থনৈতিকভাবে খুব ধনী কোনো শহর নয়, তবে মানবিকতার দিক থেকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। স্থানীয় বাসিনি (Bassini) হাসপাতাল, জীবন সুরক্ষাবিষয়ক বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সমাজকল্যাণমূলক বিভাগের সহায়তায় এখানে একটি কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা নেটওয়ার্ক রয়েছে। সংকটকালে সাহায্য চাওয়ার এমন প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন শিশুটিকে একা ফেলে দেওয়ার মতো চরম পথ বেছে নেওয়া হলো, তা ভাবিয়ে তুলছে স্থানীয় প্রশাসনকে।

এদিকে ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান এবং শিশুটির জন্মদাত্রী মাকে শনাক্ত করতে জোর তৎপরতা শুরু করেছে স্থানীয় পুলিশ ও তদন্তকারী দল। পুলিশের একটি প্রাথমিক অনুমান হলো, নবজাতককে হয়তো পাশের ‘সান্তা ফামিলিয়া’ (Santa Famiglia) চার্চের আশ্রয়ে রেখে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সে সময় চার্চে একটি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠান চলমান থাকায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হয়তো ভেতরে যেতে সাহস পাননি। পরে চার্চের যাওয়ার পথে সড়কের পাশের একটি নির্জন গাছের নিচে ব্যাগটি রেখে সটকে পড়েন। তদন্তকারীরা ওই এলাকার প্রকাশ্য সড়কের সিসিটিভি ক্যামেরার পাশাপাশি স্থানীয় আবাসিক ভবনগুলোর ব্যক্তিগত ক্যামেরার ফুটেজ গভীরভাবে পর্যালোচনা করছেন, যাতে দ্রুত অভিযুক্ত ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া যায়।

মিলানে গাছের নিচে পরিত্যক্ত নবজাতক জীবিত উদ্ধার; হাসপাতালে আশঙ্কামুক্ত, মেয়রের আশ্বাস—“পুরো সমাজের সন্তান” হিসেবে শিশুটির সুরক্ষা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা হবে।

Tgr

Share This Article