শিক্ষা ও তরুণ প্রজন্মের জন্য বাজেট বৃদ্ধি এবং লাগামহীন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের দাবিতে মিলান, জেনোভা, নাপোলি ও বোলনিয়াসহ দেশটির প্রধান প্রধান শহরে বিশাল বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।
জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, দ্রব্যমূল্যের আকাশচুম্বী ঊর্ধ্বগতি এবং সামরিক খাতে ব্যয়ের বিরুদ্ধে ইতালিজুড়ে বড় ধরনের গণবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। ‘ভবিষ্যতকে ফিরিয়ে নাও’—এই আহ্বানকে সামনে রেখে দেশটির উত্তর থেকে দক্ষিণ প্রান্তের প্রধান শহরগুলোতে রাজপথে নেমে এসেছেন লাখ লাখ মানুষ। বিক্ষোভকারীদের তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও সাধারণ শ্রমিক মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ মানুষ দেশব্যাপী এই প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেন। আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবি—অস্ত্র ও যুদ্ধের পেছনে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় বন্ধ করে তরুণ প্রজন্ম, শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক নিরাপত্তায় বরাদ্দ বাড়াতে হবে এবং সাধারণ নাগরিকের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়া নিত্যপণ্যের দাম অবিলম্বে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া সাধারণ কর্মজীবীরা জানান, দিনরাত হাড়ভাঙা খাটুনি খেটেও বর্তমান সময়ে সংসারের ন্যূনতম খরচ মেটানো অসম্ভব হয়ে পড়ছে। অনেকে একাধিক কাজ করেও জীবনযাত্রার ব্যয়ভার সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। বিক্ষোভকারীদের পক্ষ থেকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলা হয়, সাধারণ মানুষ একই ধরনের মূল্যস্ফীতি ও অতিরিক্ত জ্বালানি তেলের দামের কষাঘাতে জর্জরিত। সাধারণ জনগণের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট নয় এমন যুদ্ধের আর্থিক দায় নাগরিকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার ফলেই এই গভীর ক্ষোভের জন্ম হয়েছে।
দেশটির অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র মিলানে (Milan) বিক্ষোভের তীব্রতা ছিল বিশেষভাবে দৃশ্যমান। সেখানে আন্দোলনকারীদের কিলোমিটারব্যাপী দীর্ঘ মিছিল শহরের পূর্ব বাইপাস সড়ক ‘তানজেনসিয়ালে এস্ত’ (Tangenziale Est) পূর্ণ করে ফেলে। সরকার তাদের দাবি আমলে নেবে—এমন প্রত্যাশা নিয়েই তারা রাজপথে নেমেছেন বলে জানান অংশগ্রহণকারীরা। অন্যদিকে বন্দরনগরী জেনোভায় (Genoa) কর্মসূচির মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল প্রধান সমুদ্রবন্দর। সেখানে এক বিশাল জনস্রোত বন্দরের বিভিন্ন প্রবেশদ্বার অতিক্রম করে নিজেদের দাবির পক্ষে তীব্র স্লোগান দেয়।

এদিকে বোলনিয়া (Bologna) শহরের প্রতিবাদ কর্মসূচিতে দেখা যায় এক ব্যতিক্রমী দৃশ্য। সেখানে মিছিলরত শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দিতে এবং সম্ভাব্য অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে একদল মা সন্তানদের পাশে মানবঢাল তৈরি করে হাঁটেন। আন্দোলনে উপস্থিত এক অভিভাবক জানান, মতপ্রকাশ বা রাজপথে নামার ক্ষেত্রে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হওয়া একটি সমাজের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। সন্তানদের ভবিষ্যৎ রক্ষা করতেই তারা এই মিছিলে শামিল হয়েছেন।
দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর নাপোলিতেও (Napoli) বিক্ষোভ কর্মসূচি পরিচালিত হয় শান্তিপূর্ণভাবে। সেখানে আন্দোলনকারীরা কোনো ধরনের সংঘর্ষ ছাড়াই শহরের প্রধান রেলওয়ে স্টেশনে প্রবেশ করেন। দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যদের প্রতি সৌহার্দ্য প্রকাশ করে বিক্ষোভকারীরা তাদের স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী মিষ্টিজাতীয় খাবার ‘স্ফোলিয়াতাল্লে’ (Sfogliatelle) উপহার দেন। আন্দোলনকারীদের মতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও সাধারণ নাগরিক; তাদেরও চড়া দামে পেট্রল কিনতে হয়, বাজারে গিয়ে দ্রব্যমূল্যের চাপে পড়তে হয় এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে লড়াই করতে হয়।
ইতালির বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়া এই প্রতিবাদ কর্মসূচি থেকে নাগরিকদের অভিন্ন ক্ষোভ ও হতাশার চিত্র ফুটে উঠেছে। যুদ্ধ ও সমরাস্ত্রের ব্যয় কমিয়ে শিক্ষা খাত ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে কার্যকর সরকারি পদক্ষেপের দাবিটি এখন দেশজুড়ে জোরদার হচ্ছে।
Rai News
ইতালিজুড়ে প্রায় ১০ লাখ শিক্ষার্থী, শ্রমিক, শিক্ষক ও অভিভাবকের বিক্ষোভ: জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, শিক্ষা ও তরুণদের ভবিষ্যতে বিনিয়োগ এবং যুদ্ধের বদলে জনকল্যাণে অর্থ বরাদ্দের দাবি।


