তৈরি পোশাক শিল্পের নেপথ্য চালিকাশক্তি প্রবাসী কর্মীদের চরম অমানবিক পরিবেশে রেখে আবাসন বাণিজ্যের অভিযোগ; ৫৮টি ফ্ল্যাটে সাঁড়াশি অভিযানে বিপুল পরিমাণ তোশক জব্দ করেছে প্রশাসন।
ইতালির দক্ষিণাঞ্চলীয় কাম্পানিয়া প্রদেশের পালমা কাম্পানিয়া (Palma Campania) শহরে প্রবাসী অভিবাসী ও বাংলাদেশি শ্রমিকদের চরম অমানবিক পরিবেশে আটকে রেখে গড়ে ওঠা অবৈধ ডরমিটরি ব্যবসার বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান পরিচালনা করেছে স্থানীয় প্রশাসন। শহরের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থিত মোট ৫৮টি অতিরিক্ত জনাকীর্ণ ফ্ল্যাটে একযোগে এই তল্লাশি চালানো হয়। অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও নোংরা পরিবেশে বিপুলসংখ্যক শ্রমিককে গাদাগাদি করে রেখে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের অভিযোগে বাড়িওয়ালা ও মধ্যস্বত্বভোগীসহ মোট ৩৬ জন ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে আইনি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
পৌরসভার নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচালিত এই বিশেষ অভিযানে বসবাসের অযোগ্য ওই ফ্ল্যাটগুলো থেকে তাৎক্ষণিকভাবে ৫৫টি জরাজীর্ণ তোশক জব্দ করা হয়। পৌর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, অতীতে পরিচালিত বিভিন্ন ধারাবাহিক অভিযানের পর জব্দকৃত তোশকের সংখ্যা এখন প্রায় পাঁচশতে গিয়ে ঠেকেছে, যা স্থানীয় পৌরসভার গুদামে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, এসব তথাকথিত আবাসিক ফ্ল্যাটে শুধু অবিবাহিত প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকরাই নন, অত্যন্ত মানবেতর ও অস্বাস্থ্যকর পরিস্থিতিতে বেশ কয়েকজন শিশুকে নিয়ে পরিবারগুলোকেও বসবাস করতে দেখা গেছে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, স্থানীয় তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতের মূল চালিকাশক্তি হলেন প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকরা। এই অঞ্চলের আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির চাকা তাঁদের শ্রমে সচল থাকলেও, তাঁদের বসবাসের সুযোগ-সুবিধা একেবারেই শোচনীয়। অভিযানে দেখা যায়, মাত্র ৩০ বর্গমিটারের একটি সংকীর্ণ ড্রয়িংরুম বা কক্ষে প্রায় ১০ জন পুরুষ শ্রমিক গাদাগাদি করে বাস করছেন। পর্যাপ্ত বিছানা ও স্থানের অভাবে দীর্ঘ সময় কারখানায় কাজ শেষে ফিরে অনেকেই পালাক্রমে ঘুমাতে বাধ্য হন। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ওই সব খুপরি ঘরের ভেতরের পরিবেশ এতটাই অনিরাপদ যে বিছানার ঠিক মাথার কাছেই বসানো রয়েছে রান্নার একাধিক অরক্ষিত গ্যাস সিলিন্ডার। এমন বিপজ্জনক পরিস্থিতির কারণে সম্প্রতি ওই এলাকার ডরমিটরিগুলোতে দুটি মারাত্মক অগ্নিকাণ্ডের দুর্ঘটনাও ঘটেছে।
আইনের ফাঁকফোকর গলে বাইরে থেকে এসব ফ্ল্যাটকে সাধারণ ‘গেস্টহাউস’ বা বৈধ রুম ভাড়া (finti affittacamere) হিসেবে দেখানো হলেও, ভেতরে মূলত অভিবাসীদের চরম আবাসন সংকটকে পুঁজি করে একটি শোষণমূলক চক্র গড়ে উঠেছিল। এই অসাধু বাণিজ্যের মাধ্যমে মানুষের অসহায়ত্বকে আয়ের এক বিশাল খনি বানিয়ে ফেলেছিল জড়িতরা। শহরের মেয়র নেল্লো দোন্নারুম্মার (Nello Donnarumma) কঠোর নির্দেশে এই চক্রের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযান পরিচালিত হয়। তদন্তে দেখা গেছে, স্থানীয় বাড়িওয়ালাদের সঙ্গে মূল ভাড়াটে বা সাবলেট পরিচালনাকারীদের পারস্পরিক যোগসাজশ রয়েছে, যারা অসহায় অভিবাসীদের কাছ থেকে মাথা পিছু চড়া ভাড়া আদায় করত।
পালমা কাম্পানিয়ার স্থানীয় অর্থনীতি যখন পোশাক উৎপাদনের মাধ্যমে বিপুল মুনাফা অর্জন করছে, তখন জব্দ হওয়া শত শত জরাজীর্ণ তোশক সেখানকার একটি রূঢ় ও অস্বস্তিকর সত্যকে সামনে নিয়ে এসেছে। স্থানীয় প্রশাসন নিশ্চিত করেছে, অভিবাসী কর্মীদের জীবনের নিরাপত্তা বিপন্ন করে এবং মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে যারা এমন আবাসন বাণিজ্য পরিচালনা করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে। একইসঙ্গে অনিরাপদ ও অতিরিক্ত ভিড়যুক্ত ফ্ল্যাটগুলোর বিরুদ্ধে এমন নজরদারি আরও জোরদার করা হবে।
পালমা কাম্পানিয়ায় ৫৮টি অতিরিক্ত জনবসতিপূর্ণ অ্যাপার্টমেন্টে অভিযান চালিয়ে ৫৫টি গদি জব্দ ও ৩৬ জনকে অভিযুক্ত করেছে কর্তৃপক্ষ; সেখানে বাংলাদেশি শ্রমিকসহ অভিবাসীরা মানবেতর পরিবেশে বসবাস করছিলেন।
Tgr


