ইতালিতে নিজ কন্যাকে হত্যাকারী সেই বাংলাদেশি বিল্লাল মিয়া নিখোঁজ: আরেজোতে পুলিশি সতর্কতা

4 Min Read

কাস্টিগ্লিয়ন ফিওরেন্টিনোর একটি বিশেষ স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে রোববার রাতে উধাও হয়েছেন বিল্লাল মিয়া। ২০২০ সালের সেই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের হোতাকে অত্যন্ত বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করে পুলিশ সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে।

ইতালির তুসকানি অঞ্চলের আরেজো (Arezzo) প্রদেশে চাঞ্চল্যকর এক খবর ছড়িয়ে পড়েছে। চার বছর আগে নিজের শিশুকন্যাকে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত বাংলাদেশি নাগরিক বিল্লাল মিয়া (৪৫) একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থেকে নিখোঁজ হয়েছেন। গত রোববার ২ আগস্ট এবং সোমবার ৩ আগস্টের মধ্যবর্তী রাতে কাস্টিগ্লিয়ন ফিওরেন্টিনোর (Castiglion Fiorentino) ‘পোদেরে মোদেল্লো’ (Podere modello) নামক একটি বিশেষ আবাসিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র (RSD) থেকে তিনি পালিয়ে যান। এই ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

নিখোঁজ সংবাদ ও বর্তমান পরিস্থিতি

বিল্লাল মিয়া ওই বিশেষ কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন ছিলেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত রোববার রাতের কোনো এক সময় তিনি কেন্দ্রটি থেকে সবার অলক্ষ্যে বেরিয়ে যান। এলাকাটি কর্টোনা (Cortona) মিউনিসিপ্যালিটির সীমান্তবর্তী হওয়ায় পুলিশ ও ক্যারাবিনিয়েরি (Carabinieri) বাহিনী পুরো আরেজো এবং এর পার্শ্ববর্তী প্রদেশগুলোতে ব্যাপক তল্লাশি শুরু করেছে। নিরাপত্তা কর্মকর্তারা বিল্লাল মিয়াকে বর্তমান পরিস্থিতির বিচারে ‘সামাজিকভাবে বিপজ্জনক’ বলে অভিহিত করেছেন। তার খোঁজে রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল এবং সম্ভাব্য সব জায়গায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

২০২০ সালের সেই ভয়ংকর হত্যাকাণ্ড

বিল্লাল মিয়ার এই নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটি চার বছর আগের এক নৃশংস স্মৃতিকে ফিরিয়ে এনেছে। ২০২০ সালের ২১ এপ্রিল, যখন পুরো ইতালি করোনাকালীন কঠোর লকডাউনের (Lockdown) কবলে ছিল, তখন আরেজো প্রদেশের বুসিনে (Bucine) এলাকায় নিজের ৪ বছরের শিশু কন্যাকে ‘রঙ্কোলা’ (Roncola—এক ধরণের ধারালো দা) দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেন বিল্লাল। সেই সময় তিনি ইতালির একটি অলঙ্কার তৈরির কারখানায় (Orafo) স্বর্ণশ্রমিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন, কিন্তু মহামারীর কারণে তাকে সাময়িক কর্মহীন বা ‘কাসা ইনতেগ্রাজিওনে’ (Cassa integrazione)-তে থাকতে হয়েছিল।

হত্যাকাণ্ডের দিন বিল্লাল শুধু তার মেয়েকেই আক্রমণ করেননি, তার ১১ বছর বয়সী বড় ছেলেকেও হত্যা করতে চেয়েছিলেন। তবে সেই কিশোরটি কোনোমতে ঘর থেকে পালিয়ে প্রতিবেশীদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে প্রাণ বাঁচায়। নিজের পরিবারকে ধ্বংস করার চেষ্টা করার পর বিল্লাল মিয়া নিজেও আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন, তবে চিকিৎসকদের সহায়তায় তিনি বেঁচে ফেরেন।

আইনি মর্যাদা ও চিকিৎসাধীন অবস্থা

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে আরেজোর আদালত (Corte d’assise) এই মামলার রায় প্রদান করে। আদালত বিল্লাল মিয়াকে হত্যার দায় থেকে অব্যাহতি প্রদান করে কারণ মানসিক পরীক্ষার প্রতিবেদনে দেখা গিয়েছিল যে, অপরাধ করার সময় তিনি ‘মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন’ ছিলেন এবং নিজের কাজের ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। আদালত তাকে ১০ বছরের জন্য একটি বিশেষায়িত বিচার বিভাগীয় মানসিক কেন্দ্র বা ‘রেমস’ (REMS—Residenza per l’Esecuzione delle Misure di Sicurezza)-এ পাঠানোর নির্দেশ দেয়। উল্লেখ্য, রেমস হলো এমন একটি প্রতিষ্ঠান যেখানে অপরাধী মানসিক রোগীদের রাখা হয়।

পরবর্তীতে কয়েক মাস আগে, তার মানসিক অবস্থার আপাত উন্নতির কথা বিবেচনা করে তাকে তুলনামূলক কম কড়াকড়ির কেন্দ্র ‘পোদেরে মোদেল্লো’-তে স্থানান্তর করা হয়েছিল। সেখানে তাকে ‘লিবার্তা ভিজিলিয়াতা’ (Libertà vigilata) বা বিশেষ নজরদারিতে স্বাধীনতার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। আইনত একে কারাগার থেকে পালানো বা ‘ইভাজিওন’ বলা না গেলেও, কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া নিখোঁজ হওয়াকে বড় ধরণের ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

চিকিৎসা ঝুঁকি ও নিরাপত্তা শঙ্কা

বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন যে, বিল্লাল মিয়া নিখোঁজ থাকার ফলে তার নিয়মিত প্রয়োজনীয় ঔষধ বা থেরাপিউটিক চিকিৎসা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি যদি তার নিয়মিত ঔষধ গ্রহণ বন্ধ করে দেন, তবে পুনরায় সহিংস হয়ে ওঠার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তাকে খুঁজে পাওয়া গেলে পুনরায় তাকে কঠোর নজরদারির ‘রেমস’ কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেওয়া হতে পারে।

এই মুহূর্তে আরেজো এবং এর আশেপাশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সন্দেহভাজন কাউকে দেখা গেলে সরাসরি স্থানীয় পুলিশ স্টেশনে যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে। হ্যালো ইতালির সাথেই থাকুন পরবর্তী আপডেটের জন্য।

২০২০ সালে চার বছর বয়সী কন্যাকে হত্যার পর মানসিকভাবে অক্ষম ঘোষিত বিলাল মিহা চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইতালির একটি মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে নিখোঁজ হয়েছেন; পুলিশ তাকে খুঁজছে।

corrierefiorentino.corriere

TAGGED:
Share This Article