স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী ইতালিতে মা হওয়ার গড় বয়স দাঁড়িয়েছে ৩৩.৪ বছরে; পাশাপাশি দক্ষিণ ইতালির অঞ্চলগুলোতে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান জন্মদানের হার উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
ইতালিতে নারীদের দেরিতে মা হওয়ার প্রবণতা এবং সামগ্রিক জন্মহারে অব্যাহত পতন দেশটির জনতাত্ত্বিক কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইতালির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত ‘বারার্থ ইভেন্ট রিপোর্ট ২০২৫’ (Certificato di Assistenza al Parto 2025) অনুযায়ী, দেশটির নারীরা এখন জীবনের অনেক পরবর্তী সময়ে সন্তান গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। বর্তমানে ইতালীয় নাগরিকদের মধ্যে মা হওয়ার গড় বয়স বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩.৪ বছরে, যা ২০২৪ সালে ছিল ৩৩.৩ বছর। অন্যদিকে, দেশটিতে বসবাসরত বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে এই গড় বয়স ৩১.৪ বছর।
জন্মহারে বড় পতন ও প্রবাসীদের ভূমিকা
মন্ত্রণালয়ের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইতালিতে আশঙ্কাজনকভাবে কমছে নবজাতকের সংখ্যা। ২০২৪ সালে যেখানে ৩ লাখ ৭০ হাজার ৫৭৭টি শিশু জন্ম নিয়েছিল, সেখানে ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৫৩ হাজার ২৪০টিতে। এই পরিস্থিতির মধ্যেও প্রবাসী নারীদের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ইতালিতে জন্ম নেওয়া মোট শিশুর প্রায় ২০.৭ শতাংশই বিদেশি নাগরিক বা অভিবাসী পরিবারের।
প্রতিবেদনটি আরও বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইতালীয় নারীদের ক্ষেত্রে প্রথমবার মা হওয়ার গড় বয়স বর্তমানে ৩২.৫ বছর, যেখানে বিদেশি নারীদের ক্ষেত্রে তা ২৯.৪ বছর। অভিবাসী নারীদের এই অপেক্ষাকৃত কম বয়সে সন্তান গ্রহণের প্রবণতাই ইতালির ক্রমহ্রাসমান জন্মহারকে কিছুটা ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় রেখেছে। তবে সন্তান সংখ্যা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। ২০১৫ সালে নারী প্রতি সন্তান জন্মদানের হার ছিল ১.৩৫, যা ২০২৫ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ১.১৪-তে। অনেক ইতালীয় পরিবারই এখন দ্বিতীয় বা তৃতীয় সন্তান নিতে অনীহা প্রকাশ করছেন।
সিজারিয়ান ও স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে উদ্বেগ
ইতালিতে সন্তান প্রসবের ক্ষেত্রে সিজারিয়ান বা অস্ত্রোপচারের (Cesarean Section) উচ্চ হার নিয়ে সরকার ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নির্দেশিকাগুলোতে এই পদ্ধতি কমানোর কথা বলা হলেও গত বছর মোট প্রসবের ২৯.৮ শতাংশই ছিল সিজারিয়ান। এক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে বড় ব্যবধান লক্ষ্য করা গেছে। সরকারি হাসপাতালে সিজারিয়ানের হার ২৮ শতাংশ হলেও বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে তা ৪৫ শতাংশে পৌঁছেছে।
আঞ্চলিক বৈষম্যও এ ক্ষেত্রে স্পষ্ট। দক্ষিণ ইতালির কাম্পানিয়া (Campania) অঞ্চলকে এই তালিকায় ‘বাজে অবস্থানে’ রাখা হয়েছে, যেখানে ৪৩.৭ শতাংশ শিশুর জন্ম হয়েছে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে। এরপরেই রয়েছে সিসিলি ও সার্দিনিয়া (৩৯ শতাংশ)। বিপরীতে, উত্তর ইতালির তোসকানা (Tuscany) অঞ্চলে এই হার মাত্র ১৬ শতাংশ।

রাজনৈতিক মহাসপাতালের নিরাপত্তা ও সামাজিক পরিবর্তনতবিরোধ ও প্রেক্ষাপট
প্রতিবেদনে একটি আশঙ্কাজনক তথ্য উঠে এসেছে যে, ইতালিতে প্রতি ১০টি শিশুর মধ্যে একটি জন্ম নিচ্ছে এমন ছোট হাসপাতালে, যেখানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম বা সুযোগ-সুবিধা নেই। বছরে ৫০০-এর কম প্রসব হয় এমন কেন্দ্রগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করা হলেও প্রায় ১০ শতাংশ প্রসব সেখানেই সম্পন্ন হচ্ছে। তবে ইতিবাচক দিক হলো, ৯১.৩ শতাংশ নারীই প্রসবের জন্য পাবলিক হাসপাতালগুলোকে বেছে নিচ্ছেন।
সামাজিক পরিবর্তনের আরেকটি দিক হলো বিজ্ঞানের ওপর নির্ভরতা। বর্তমানে প্রতি ১০০টি গর্ভধারণের মধ্যে ৪.৬টি ক্ষেত্রে দম্পতিরা ‘অ্যাসিস্টেড রিপ্রোডাকশন’ বা কৃত্রিম প্রজনন প্রযুক্তির সাহায্য নিচ্ছেন। তবে পারিবারিক বন্ধনের একটি উজ্জ্বল চিত্র ফুটে উঠেছে পরিসংখ্যানে; প্রায় ৯৪.৭ শতাংশ ক্ষেত্রে সন্তান জন্মদানের সময় বাবারা হাসপাতালে মায়ের পাশে উপস্থিত থাকছেন। এছাড়া গর্ভাবস্থায় চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার হারও বেড়েছে। বর্তমানে ৯৪ শতাংশ নারী গর্ভাবস্থায় চারটির বেশি মেডিকেল চেকআপ বা আল্ট্রাসাউন্ড করাচ্ছেন, যা নিরাপদ প্রসবের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক লক্ষণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইতালিতে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটিসহ অন্যান্য অভিবাসীদের জন্য এই প্রতিবেদনটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ উন্নত স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি দেরিতে সন্তান গ্রহণের এই সামাজিক প্রভাব সরাসরি শ্রমবাজার ও দীর্ঘমেয়াদী অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে। সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ এখন জন্মহার বৃদ্ধি এবং দক্ষিণ অঞ্চলের হাসপাতালগুলোতে সিজারিয়ান সেকশন কমানোর ওপর নিবদ্ধ থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইতালিতে মাতৃত্বের গড় বয়স বেড়ে ৩৩.৪ বছর; ২০২৫ সালে জন্মহার কমে ৩,৫৩,২৪০-এ নেমেছে, আর মোট প্রসবের ২৯.৮% হয়েছে সিজারিয়ানে।
ansa


