রোম থেকে মিনাহজ হোসাইনের প্রতিবেদনঃ
মাদারীপুরের একটি মধ্যবিত্ত পরিবার তাদের সন্তানকে উন্নত জীবনের আশায় ইউরোপ পাঠাতে গিয়ে আজ নিঃস্ব; লিবিয়ার মাফিয়া চক্রের হাতে বন্দি ও নির্যাতনের শিকার রাজীব মীর দেড় বছর ধরে নিখোঁজ থাকায় দিশেহারা স্বজনরা।
উন্নত জীবনের হাতছানি আর ইতালিতে ভালো কোনো কাজের প্রলোভন কীভাবে একটি পরিবারকে পথে বসাতে পারে, তার এক মর্মান্তিক দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে মাদারীপুরের রাজীব মীর। দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী থাকাকালীন রঙিন স্বপ্ন বুনেছিলেন ইতালিতে পাড়ি জমানোর। কিন্তু সেই স্বপ্নই এখন তার পরিবারের জন্য এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়ে লিবিয়ায় পাচার হওয়া রাজীবের জন্য সাড়ে ৩৬ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়েও গত ১৮ মাস ধরে তার কোনো খোঁজ পাচ্ছে না পরিবার।
স্বপ্ন থেকে নরককুণ্ডে রাজীব
ঘটনার শুরু ২০২৩ সালের প্রথম দিকে। মাদারীপুর সদর উপজেলার হোগলপাতিয়া গ্রামের খবির মীরের ছেলে রাজীব মীরকে সরাসরি ইতালি পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় পার্শ্ববর্তী ডাসার উপজেলার ঘুঙ্ঘিয়ারকুল গ্রামের লোকমান হাওলাদার। লোকমান নিজেকে পাচারকারী চক্রের প্রভাবশালী সদস্য হিসেবে পরিচয় দিয়ে রাজীবের পরিবারের সাথে বড় অঙ্কের চুক্তি করে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, চুক্তির প্রথম কিস্তি হিসেবে ২০ লাখ টাকা লোকমান ও তার চক্রের হাতে তুলে দেয় রাজীবের পরিবার। এরপর ২০২৩ সালের ৪ আগস্ট রাজীবকে ইতালির উদ্দেশ্যে দেশ থেকে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে ইতালি যাওয়ার স্বপ্নযাত্রার পথ বদলে যায় লিবিয়ায়। সেখানে পৌঁছানোর পর রাজীবকে ইতালিতে পার না করে একটি আন্তর্জাতিক মাফিয়া চক্রের কাছে বিক্রি করে দেয় পাচারকারীরা।
নির্যাতন ও অর্থ আদায়
লিবিয়ার বন্দিশালায় রাজীবের ওপর শুরু হয় অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। মাফিয়া চক্রটি সেই নির্যাতনের লোমহর্ষক দৃশ্য ভিডিও কল ও অডিও রেকর্ডের মাধ্যমে মাদারীপুরে থাকা তার বাবা-মায়ের কাছে পাঠাত। সন্তানের ওপর চলা নির্মম নির্যাতনের দৃশ্য সইতে না পেরে রাজীবের পরিবার আরও সাড়ে ১৬ লাখ টাকা ধার-দেনা ও জায়গা-জমি বিক্রি করে মুক্তিপণ হিসেবে পাঠায়।
সর্বমোট ৩৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করার পরও পাচারকারী চক্রটি ক্ষান্ত হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, সম্প্রতি রাজীবকে জীবিত ফেরত দেওয়ার শর্তে তারা আরও ২০ লাখ টাকা দাবি করছে। দাবি করা অতিরিক্ত টাকা দিতে না পারায় গত প্রায় দেড় বছর ধরে রাজীবের সাথে পরিবারের সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

নিঃস্ব পরিবারের হাহাকার
সন্তান হারিয়ে এবং পাওনাদারদের চাপে রাজীবের বাবা খবির মীর এখন পুরোপুরি বিপর্যস্ত। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “ছেলের একটা উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য আমরা নিজেদের শেষ সম্বলটুকুও দিয়েছি। জায়গা-জমি বিক্রি করেছি, আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছি। এখন আমাদের টাকাও শেষ, ছেলেরও কোনো হদিস নেই। আমরা জানি না আমার ছেলে বেঁচে আছে না কি মারা গেছে।”
রাজীবের নিখোঁজ সংবাদে পুরো গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা এই বর্বরোচিত ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তারা বলছেন, দালাল লোকমান হাওলাদারের মতো লোকজনের কারণেই গ্রামের তরুণরা আজ বিপথগামী হচ্ছে। অভিযুক্ত লোকমান ও তার সহযোগীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি তুলেছেন এলাকাবাসী।
আইনি পদক্ষেপ ও সরকারি সহায়তার আবেদন
ভুক্তভোগী পরিবারটি এখন কেবল আইনি প্রক্রিয়ার ওপরই ভরসা রাখছে না, তারা বাংলাদেশ সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করছে। দালাল চক্রের সদস্যদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি নিখোঁজ রাজীবকে লিবিয়া থেকে জীবিত উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতি আকুল আবেদন জানিয়েছেন তারা।
মানবাধিকার কর্মীদের মতে, মাদারীপুর ও শরীয়তপুর অঞ্চল থেকে অবৈধভাবে ইতালি যাওয়ার প্রবণতা অনেক বেশি, যা এই ধরনের পাচারকারী চক্রকে আরও শক্তিশালী করছে। রাজীবের এই ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করল যে, দালালের মাধ্যমে অবৈধ পথে বিদেশ যাত্রা কেবল জীবনের ঝুঁকিই নয়, বরং পুরো একটি পরিবারকে সমূলে ধ্বংস করে দিতে পারে। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক এই পাচারকারী নেটওয়ার্কের শিকড় অনেক গভীরে এবং দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে নিখোঁজদের ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসবে।
ইতালিতে পাঠানোর প্রলোভনে সাড়ে ৩৬ লাখ টাকা খুইয়ে লিবিয়ায় প্রায় দেড় বছর ধরে নিখোঁজ মাদারীপুরের ২২ বছর বয়সী রাজীব মীর—পরিবার এখনো তার সন্ধান পায়নি।
খবরের কাগজ


