চলতি বছরের প্রথমার্ধে ভূমধ্যসাগরে অন্তত ১,৬৬৮ জন অভিবাসী প্রাণ হারিয়েছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন, যাদের মধ্যে ২৬ শতাংশই বাংলাদেশি নাগরিক। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মতে, উদ্ধার তৎপরতায় আইনি বাধা এবং দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ নতুন রুট এই মানবিক বিপর্যয়কে আরও উসকে দিচ্ছে।
ইউরোপের উন্নত জীবনের আশায় উত্তাল ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে অভিবাসীদের মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘতর হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সেন্ট্রাল ভূমধ্যসাগরীয় রুটে চলাচলকারী অভিবাসীদের তালিকায় এখন শীর্ষস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। গত বছরের তুলনায় এ বছর নিহতের সংখ্যা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও থামছে না এই বিপজ্জনক নৌযাত্রা। বরং ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও উপকূলীয় কড়াকড়ির কারণে যাত্রাপথ আরও দীর্ঘ ও প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)-এর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ভূমধ্যসাগরে অন্তত ১,৬৬৮ জন অভিবাসী প্রাণ হারিয়েছেন অথবা নিখোঁজ হয়েছেন। গত বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ১,০৩৫ জন। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের মধ্যে ৮৭২ জনই প্রাণ হারিয়েছেন সেন্ট্রাল ভূমধ্যসাগরীয় রুটে, যা উত্তর আফ্রিকা থেকে ইতালি অভিমুখে বিস্তৃত। বেসরকারি সংস্থা ‘এসওএস মেদিতারানে’ (SOS Mediterranee)-এর ২০২৫ সালের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই পথে যাত্রা করা অভিবাসীদের মধ্যে ২৬ শতাংশই বাংলাদেশি। তালিকায় বাংলাদেশের পরেই রয়েছে ইরিত্রিয়া (১৬%), সুদান (১৩%), পাকিস্তান (১২%) এবং মিশর (৯%)।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ার পেছনে বড় কারণ হলো যাত্রাপথের পরিবর্তন। লিবিয়ার পশ্চিম উপকূলে কড়াকড়ি বাড়ায় অভিবাসীরা এখন লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় ‘তব্রুক রুট’ বেশি ব্যবহার করছেন। এই পথটি গ্রিসের ক্রিট দ্বীপের সাথে যুক্ত, যা আগের রুটগুলোর তুলনায় প্রায় তিন থেকে চার গুণ বেশি দীর্ঘ। ছোট এবং অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই জরাজীর্ণ নৌকায় এত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে প্রায়ই নৌকাডুবির ঘটনা ঘটছে। উদাহরণস্বরূপ, গত জুলাই মাসে তব্রুক উপকূলে দুটি নৌকা ডুবে অন্তত ৫০ জন নিখোঁজ হন। এছাড়া জানুয়ারি মাসে ‘ঝড় হ্যারি’ চলাকালীন তিউনিসিয়া থেকে ছাড়া প্রায় ৩০টি নৌকার অন্তত এক হাজার অভিবাসী নিখোঁজ হওয়ার তথ্য দিয়েছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো।

মৃত্যুর মিছিল বাড়ার পেছনে ইতালির অভ্যন্তরীণ নীতিকেও দায়ী করছেন উদ্ধারকর্মীরা। ২০২৩ সালে ইতালিতে পাস হওয়া ‘পিয়ান্তেদোসি ডিক্রি’ (Piantedosi Decree) মানবিক উদ্ধারকারী জাহাজগুলোর কার্যক্রমকে সীমিত করে দিয়েছে। এই আইন অনুযায়ী, কোনো জাহাজ সমুদ্রে কাউকে উদ্ধার করার পর সরাসরি নির্ধারিত বন্দরে ফিরে যেতে বাধ্য থাকে, ফলে তারা একই যাত্রায় একাধিক উদ্ধার অভিযান চালাতে পারে না। অনেক ক্ষেত্রে এসব উদ্ধারকারী জাহাজকে মূল এলাকা (SAR Zone) থেকে কয়েকশ কিলোমিটার দূরের বন্দরে পাঠানো হয়। এসওএস মেদিতারানে জানিয়েছে, এই আইনি জটিলতার কারণে গত ১০ বছরে তারা সমুদ্রে প্রায় ৫৯১ দিনের উদ্ধার তৎপরতা হারিয়েছে।
এদিকে, লিবীয় কোস্টগার্ডের ভূমিকা নিয়েও আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনা জোরালো হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত এই বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রায়ই উদ্ধারকারী জাহাজে গুলি চালানোর অভিযোগ ওঠে। জার্মান এনজিও ‘সি-ওয়াচ’ (Sea-Watch) জানিয়েছে, গত মে মাসে লিবীয় কোস্টগার্ড তাদের কর্মীদের লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করে যখন তারা ৯০ জন অভিবাসীকে উদ্ধারের চেষ্টা করছিলেন।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)-এর তথ্যমতে, লিবিয়া ও তিউনিসিয়া থেকে ইউরোপে পৌঁছানো মানুষের সংখ্যা গত বছরের তুলনায় কিছুটা কমলেও মৃত্যুর হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, অভিবাসীদের ঠেকাতে ইউরোপের সীমান্ত ব্যবস্থা কঠোর করা হলেও পাচারকারীরা নতুন ও আরও বিপদসংকুল পথ বেছে নিচ্ছে, যার চূড়ান্ত পরিণতি হচ্ছে আরও বেশি প্রাণহানি।
২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ভূমধ্যসাগরে ১,৬৬৮ অভিবাসী নিহত বা নিখোঁজ; সেন্ট্রাল রুটে যাত্রীদের ২৬ শতাংশ বাংলাদেশি, একই সময়ে উদ্ধারতৎপরতাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ansa


