ইতালির আনকোনায় ফিনকানতিয়েরি শিপইয়ার্ডে অগ্নিকাণ্ড: তিউনিসীয় শ্রমিকের মৃত্যু, আশঙ্কাজনক এক বাংলাদেশি

4 Min Read

কাজের নাইট শিফট শুরুর কিছুক্ষণ পরই আকস্মিক আগুনের তীব্র ঝলকানিতে এই দুর্ঘটনা ঘটে; অগ্নিদগ্ধ বাংলাদেশিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য পিসা বার্ন সেন্টারে স্থানান্তর।

ইতালির কেন্দ্রীয় উপকূলীয় শহর আনকোনার খ্যাতনামা জাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ‘ফিনকানতিয়েরি’ (Fincantieri) শিপইয়ার্ডে এক ভয়াবহ কর্মক্ষেত্র দুর্ঘটনায় এক শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে এবং অপর এক বাংলাদেশি কর্মী মারাত্মকভাবে দগ্ধ হয়েছেন। গত মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর রাতের শিফটে কাজ শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে এক আকস্মিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এই হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো ব্যক্তি তিউনিসিয়ার নাগরিক এবং তিনি সন্তানসন্ততি নিয়ে একটি পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম অভিভাবক ছিলেন। অন্যদিকে, আগুনের লেলিহান শিখায় গুরুতর দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন এক বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিক। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় আনকোনা শহরজুড়ে শোক ও উদ্বেগের ছায়া নেমে এসেছে।

শিপইয়ার্ড ও স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, দুর্ঘটনার শিকার হওয়া ওই দুই কর্মী ফিনকানতিয়েরির সরাসরি স্থায়ী কর্মী ছিলেন না; বরং তারা একটি সহযোগী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের (ditta appaltatrice) অধীনে জাহাজ নির্মাণের কাজে নিয়োজিত ছিলেন। রাতের শিফট শুরু হওয়ার পরপরই কর্মস্থলে কাজ করার সময় হঠাৎ করেই তাদের ওপর একটি বিকট অগ্নস্ফূলিঙ্গ বা তীব্র আগুনের ঝলকানি (fiammata) আছড়ে পড়ে। আগুনের তীব্রতা ও উত্তাপ এতটাই বিধ্বংসী ছিল যে ঘটনাস্থলেই তিউনিসীয় শ্রমিকের মৃত্যু ঘটে। কারখানার অন্যান্য সহকর্মীরা দ্রুত উদ্ধারে এগিয়ে আসলেও ততক্ষণে তার দেহ সম্পূর্ণ নিথর হয়ে পড়েছিল।

এদিকে অগ্নিকাণ্ডে গুরুতরভাবে ঝলসে যাওয়া বাংলাদেশি শ্রমিকের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। দুর্ঘটনার পরপরই কারখানার ভেতরে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাকে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। তবে তার শরীরের সিংহভাগ অংশ গভীরভাবে পুড়ে যাওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে তাকে তোসকানা অঞ্চলের পিসা শহরের বিশেষায়িত বার্ন সেন্টারে (Centro Grandi Ustionati di Pisa) স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। জটিল ও গুরুতর দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসার জন্য এই কেন্দ্রটি ইতালিজুড়ে অন্যতম প্রধান ভরসাস্থল। বাংলাদেশি এই প্রবাসী কর্মীর জীবন রক্ষায় চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

ঘটনার পরপরই শিপইয়ার্ডের ভেতরে নিজস্ব জরুরি উদ্ধার প্রটোকল কার্যকর করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট সব উদ্ধারকারী সংস্থাকে দ্রুত খবর দেওয়া হয়। এই মর্মান্তিক প্রাণহানিতে গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেছে ফিনকানতিয়েরি কর্তৃপক্ষ। এক শোকবার্তায় সংস্থাটি জানায়, আনকোনা ইয়ার্ডে দুর্ঘটনায় নিহত শ্রমিকের পরিবার ও তার শোকস্তব্ধ সহকর্মীদের প্রতি তারা আন্তরিক সহমর্মিতা জানাচ্ছে। একই সঙ্গে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন বাংলাদেশি কর্মীর শারীরিক অবস্থার যেন দ্রুত উন্নতি ঘটে, সেই প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি আরও স্পষ্ট করেছে যে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা একটি বহিরাগত প্রতিষ্ঠানের কর্মী হলেও দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ ও প্রযুক্তিগত পরিস্থিতি উদঘাটনে তারা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও তদন্তকারীদের সাথে শতভাগ সহযোগিতা বজায় রাখবে।

হঠাৎ কীভাবে এই অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত ঘটল, কোনো গ্যাস বা রাসায়নিক ত্রুটি ছিল কি না, কিংবা সেখানে পর্যাপ্ত পেশাগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল কি না—তা খতিয়ে দেখতে স্থানীয় পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যেই আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে। ইতালির জাহাজ নির্মাণ এবং ভারী উৎপাদন শিল্পে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি ও অভিবাসী শ্রমিক নিয়োজিত রয়েছেন। কর্মক্ষেত্রে এমন প্রাণহানি প্রবাসীদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে মূল প্রতিষ্ঠানের অধীনে না রেখে সাব-কন্ট্রাক্টিং বা ঠিকাদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করানোর প্রক্রিয়া নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহলেও আলোচনা শুরু হয়েছে।


আনকোনার ফিনকান্তিয়েরি শিপইয়ার্ডে রাতের শিফটে আকস্মিক আগুনে দুই শ্রমিক হতাহত: এক তিউনিসিয়ান শ্রমিক নিহত, গুরুতর দগ্ধ বাংলাদেশি শ্রমিককে চিকিৎসার জন্য পিসায় স্থানান্তর করা হচ্ছে।

anconatoday

Share This Article