ঢাকায় স্বরাষ্ট্র ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে মানবপাচার প্রতিরোধ, ইন্টারপোলভিত্তিক সীমান্ত নজরদারি এবং বৈধ পথে দক্ষ কর্মী প্রেরণে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
বাংলাদেশ সচিবালয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) স্বরাষ্ট্র ও অভিবাসনবিষয়ক কমিশনার ম্যাগনাস ব্রুনারের নেতৃত্বে আগত একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের পৃথক দুটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সোমবার (১২ অক্টোবর) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এসব বৈঠকে মানবপাচার ও অনিয়মিত অভিবাসন কঠোর হাতে দমন, ইউরোপের শ্রমবাজারে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি এবং সীমান্ত নিরাপত্তা আধুনিকায়নের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে জানানো হয়, রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে এখন ‘নিরাপদ দেশ’ (সেইফ কান্ট্রি) হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কমিশনার ম্যাগনাস ব্রুনার উল্লেখ করেন, দেশে একটি স্থিতিশীল সরকার ও অনুকূল অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি বিরাজ করায় আশ্রয়প্রার্থীদের প্রেক্ষাপটে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। তিনি জানান, বর্তমানে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রায় ৫ লাখ বাংলাদেশি বৈধভাবে বসবাস করছেন। অবৈধ অনুপ্রবেশের পথ পুরোপুরি রুদ্ধ করা গেলে ইউরোপীয় দেশগুলোতে বৈধ পথে বাংলাদেশিদের কাজের সুযোগ অনেক সহজ হবে। এ সময় মন্ত্রী জানান, অভিবাসন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় অনিয়মের দায়ে সরকার ইতোমধ্যে ৫২টি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করেছে।
এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে অবৈধ অভিবাসন ও মানবপাচারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ‘জিরো টলারেন্স’ অবস্থানের কথা দৃঢ়ভাবে ব্যক্ত করা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ পথে সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার প্রবণতা শূন্যে নামিয়ে ইউরোপের বাজারে শতভাগ বৈধ ও আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ জনশক্তি পাঠাতে চায় বাংলাদেশ। অভিবাসনপ্রত্যাশীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে উভয় পক্ষই যৌথভাবে কাজ করার বিষয়ে একমত হয়।

বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়াকে বেগবান করতে ‘ট্যালেন্ট পার্টনারশিপ’ উদ্যোগের আওতায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রায় ৭৫০ জন দক্ষ কর্মীর ইউরোপীয় সনদের জটিলতা নিয়ে আলোচনা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইউরোপীয় বিশেষজ্ঞদের সরাসরি বাংলাদেশে এসে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ ও সনদ দেওয়ার আহ্বান জানালে ইইউ প্রতিনিধিদল তাতে ইতিবাচক সাড়া দেয়।
সীমান্ত ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, দেশের সব আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, সমুদ্র ও স্থলবন্দরে অপরাধী শনাক্ত এবং যাত্রী চলাচল পর্যবেক্ষণে চলতি বছরের শেষ নাগাদ ‘অ্যাডভান্সড প্যাসেঞ্জার ইনফরমেশন অ্যান্ড বর্ডার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ চালু করা হবে, যা সরাসরি ইন্টারপোলের ডেটাবেজের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। এছাড়া ইউরোপীয় বর্ডার অ্যান্ড কোস্ট গার্ড এজেন্সি ফ্রন্টেক্সের (Frontex) সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারত্ব গড়ার প্রক্রিয়াও ইতিবাচকভাবে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকটকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ এবং আরাকান আর্মির ওপর কার্যকর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি। ইইউ প্রতিনিধিদল এ বিষয়ে সম্মিলিত কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দেয়। বৈঠকে বাংলাদেশে নিযুক্ত ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার, ডিরেক্টর হেনরিক নিলসেন, ক্যাবিনেট সদস্য গ্রিগোরিওস ডেলাভেকোরাস, ডেপুটি হেড অব মিশন বাইবা জারিনা এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ অবৈধ অভিবাসন ও মানবপাচারে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিয়েছে; ইইউর সঙ্গে বৈধ ও দক্ষ কর্মী পাঠানো, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার এবং বাংলাদেশিদের অভিবাসন পরিস্থিতি নিয়ে সহযোগিতা বাড়ানোর আলোচনা হয়েছে।
bd-pratidin


