ইতালির ‘ডিক্রেতো ফ্লুসি’ ব্যবস্থায় বড় ধরনের অসঙ্গতির অভিযোগ: গৃহকর্মে ৯০ শতাংশ আবেদনই পুরুষদের

4 Min Read

দেশটিতে বাসাবাড়ির কাজে নিয়োজিতদের প্রায় ৮৯ শতাংশ নারী হলেও স্পনসর ভিসায় ৯০ শতাংশ আবেদন এসেছে পুরুষ কর্মীদের নামে; পুরো কোটা পদ্ধতি বাতিলের দাবি জানিয়েছে প্রভাবশালী ট্রেড ইউনিয়ন সিজিআইএল।

ইতালিতে বিদেশি কর্মী নিয়োগের বার্ষিক কোটাভিত্তিক ব্যবস্থা ‘ডিক্রেতো ফ্লুসি’ (Decreto Flussi) দেশটির শ্রমবাজারের চাহিদাপূরণে ব্যর্থ হয়েছে এবং এটি অভিবাসীদের অনিয়মিত হওয়া ও শোষণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে দেশটির শীর্ষস্থানীয় ট্রেড ইউনিয়ন ফিলকামস সিজিআইএল (Filcams Cgil)। আন্তর্জাতিক সেবা ও পরিচর্যা দিবস উপলক্ষে রোমে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে সংগঠনটি দাবি করে, ইতালির পরিবারগুলোর বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সরকারের বর্তমান কর্মী আনার প্রক্রিয়ায় চরম বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে। দেশটির শ্রম মন্ত্রণালয় ও জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা সংস্থা ইনপিএস (INPS)-এর পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে এই তথ্য তুলে ধরা হয়।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ইতালিতে বৈধভাবে নিয়োজিত গৃহকর্মী ও পারিবারিক পরিচর্যা খাতে নারীদের আধিপত্য স্পষ্ট; এ খাতে মোট নিয়োজিতদের ৮৮ দশমিক ৭ শতাংশই নারী এবং পুরুষ কর্মী মাত্র ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। অথচ ২০২৫ ও ২০২৬ সালে বাসাবাড়ির সাধারণ কাজ এবং প্রবীণদের সেবার জন্য যে ভিসা অনুমোদন বা ‘নুলা ওস্তা’ (Nulla osta)-র আবেদন জমা পড়েছে, তার ৯০ শতাংশই পুরুষ কর্মীদের নামে। ইউনিয়নের মতে, এই অস্বাভাবিক পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে গৃহপরিচর্যাকারী বা ‘কলফ’ (Colf) ও ‘বাদানতি’ (Badanti) কোটা ব্যবহার করে ভিন্ন কাজের উদ্দেশ্যে কর্মী আনার অপচেষ্টা চলছে। এতে মধ্যস্বত্বভোগী ও দালাল চক্রের প্রভাব বাড়ছে এবং কাজের সন্ধানে আসা বিদেশিরা মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন।

কেবল লিঙ্গভিত্তিক নয়, আবেদনকারীদের জাতীয়তা ও ভৌগোলিক অবস্থানের ক্ষেত্রেও ব্যাপক অমিল পাওয়া গেছে। ইনপিএস-এর তথ্য অনুসারে, দেশটিতে গৃহকর্মে নিয়োজিত বিদেশি কর্মীদের বড় অংশ পূর্ব ইউরোপ (৩৩.৫%), দক্ষিণ আমেরিকা (৯%) এবং ফিলিপাইনের (৭.৫%) নাগরিক। তবে ডিক্রেতো ফ্লুসিতে জমা পড়া আবেদনগুলোর বেশিরভাগই এসেছে এমন সব দেশ থেকে, যাদের ইতালির পারিবারিক সেবা খাতে পূর্ব অভিজ্ঞতা বা উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি নেই। একইভাবে, বৈধ গৃহকর্মীদের বড় অংশ উত্তর-পশ্চিম (৩০.৭%), মধ্যাঞ্চল (২৭.৭%) এবং উত্তর-পূর্ব (১৯.৯%) অঞ্চলে কর্মরত থাকলেও ভিসার আবেদনগুলো কেন্দ্রীভূত হয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন অঞ্চলে। এছাড়া প্রচলিত ইউনিয়ন ও নিয়োগকর্তা সংগঠনের বাইরে থাকা অজ্ঞাত তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ আবেদন দাখিল হওয়ায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

পরিসংখ্যানে আরও দেখা যায়, ২০২৫ সালে দেশটিতে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় থাকা নিবন্ধিত গৃহকর্মীর সংখ্যা ছিল ৮ লাখ ৪ হাজার ৪৬৪ জন, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ২ দশমিক ৩ শতাংশ কম। দ্রুত বার্ধক্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া একটি দেশে বৈধ কর্মীর সংখ্যা হ্রাস পাওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বর্তমানে এই খাতে প্রবীণদের সেবায় নিয়োজিত ‘বাদানতি’দের অংশ দাঁড়িয়েছে ৫১ দশমিক ৩ শতাংশে, যাদের প্রায় অর্ধেকই বছরে ৫০ থেকে ৫২ সপ্তাহ একটানা সেবা দেন। ইউনিয়নটির মতে, নিবন্ধিত কর্মী কমার অর্থ পারিবারিক সেবার চাহিদা কমা নয়, বরং অনেক কর্মী চুক্তিহীন অবৈধ শ্রমে যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছেন।

বিদ্যমান সংকট নিরসনে ফিলকামস সিজিআইএল প্রচলিত কোটা ও অনলাইনে দ্রুত আবেদন করার ‘ক্লিক ডে’ পদ্ধতি পুরোপুরি বাতিলের জোর দাবি জানিয়েছে। এর বদলে সরাসরি চাকরির সন্ধানে ইতালি আসার জন্য বৈধ ‘জব-সিকার রেসিডেন্স পারমিট’ চালু এবং ইতিমধ্যে দেশটিতে অনিবন্ধিত অবস্থায় থাকা বিদেশি শ্রমিকদের নিয়মিত বা বৈধ করার প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি। একই সঙ্গে গৃহকর্মীদের জন্য ইনপিএস-এর মাধ্যমে অসুস্থতাজনিত সরকারি ভাতা, মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা, অন্যায্য চাকরিচ্যুতি রোধে আইনি নিশ্চয়তা এবং উপযুক্ত বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়েছে।

লাখো ইতালীয় পরিবার তাদের প্রবীণ ও শিশুদের দেখাশোনার জন্য অভিবাসী কর্মীদের ওপর নির্ভরশীল। সংশ্লিষ্টদের মতে, আমলাতান্ত্রিক কোটা ব্যবস্থা সংস্কার করে শ্রম অধিকার ও বাস্তবসম্মত আইনি পথ তৈরি করা না হলে অভিবাসীদের শোষণ যেমন বন্ধ হবে না, তেমনি পরিবারগুলোর সামাজিক সুরক্ষাও বড় ধরনের সংকটে পড়বে।




ইতালিতে গৃহকর্মীদের ৮৮.৭% নারী হলেও, Decreto Flussi-এর আওতায় ২০২৫–২৬ সালে গৃহকর্মী ও কেয়ারগিভার নিয়োগের ৯০% আবেদন পুরুষদের জন্য, যা ব্যবস্থার বড় অসংগতি তুলে ধরেছে।

Stranieri In Italia

Share This Article