গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে রোমের পিয়াজ্জা ওরমিয়াতে এক হৃদয়বিদারক পরিবেশে একই পরিবারের তিন সদস্যের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে; যেখানে ইতালীয় প্রতিবেশী ও বাংলাদেশি কমিউনিটির মানুষ খুনি শাহাদাত হোসেনের দ্রুত বিচার ও আত্মসমর্পণের দাবি জানিয়েছেন।
ইতালির রাজধানী রোমের কাসালোত্তি (Casalotti) এলাকার আকাশ-বাতাস গতকাল এক করুণ সুরে ভারি হয়ে উঠেছিল। গত ২৬ জুন ভিয়া মন্টিগ্লিও-র (Via Montiglio) একটি অ্যাপার্টমেন্টে নৃশংসভাবে খুন হওয়া একই পরিবারের তিন সদস্য—কামাল উদ্দিন (৪০), তার স্ত্রী হোসনে জাহান মমতাজ (৩৮) এবং তাদের আট বছরের শিশু কন্যা আরোয়া-র শেষ বিদায় জানাতে পিয়াজ্জা ওরমিয়াতে (Piazza Ormea) ঢল নেমেছিল শত শত মানুষের। জানাজা শেষে মরদেহগুলো বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।
মঙ্গলবার বিকেল ঠিক সাড়ে ৬টায় যখন কাসালোত্তির কেন্দ্রীয় চত্বরে সারিবদ্ধভাবে তিনটি কফিন রাখা হয়, তখন উপস্থিত জনতা চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। এর মধ্যে ছোট্ট আরোয়ার জন্য রাখা হয়েছিল একটি সাদা কফিন, যা উপস্থিত সবার হৃদয়ে এক গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে। জানাজায় অংশ নেন নিহত কামাল উদ্দিনের বড় ছেলে এবং এই ট্র্যাজেডির একমাত্র জীবিত সদস্য ২০ বছর বয়সী আমির আয়ান। শোকের তীব্রতায় বাকরুদ্ধ আয়ান কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন, তবে ইতালীয় প্রতিবেশী এবং বাংলাদেশি কমিউনিটির মানুষ তাকে সান্ত্বনা ও আলিঙ্গনে আগলে রাখেন।
জানাজা পরিচালনা করেন রোমের ভিয়া দেলা মাজলানা (Via della Magliana) মসজিদের ইমাম সামি সালেম। ধর্মীয় আচার শেষে তিনি এক আবেগঘন বক্তব্য প্রদান করেন। ছোট্ট আরোয়ার কফিনের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, “তুমি নিষ্পাপ এবং তুমি জান্নাতে আছো।” এরপর তিনি সরাসরি এই হত্যাকাণ্ডের প্রধান অভিযুক্ত ও বর্তমানে পলাতক শাহাদাত হোসেনের উদ্দেশ্যে কঠোর বার্তা দেন। ইমাম বলেন, “তোমাকে অবশ্যই আত্মসমর্পণ করতে হবে। তুমি যা করেছ, তার জন্য তোমাকে শাস্তি পেতেই হবে।” বর্তমানে রোমের স্কোয়াড মোবাইল-এর প্রধান রবার্তো জুসেপ্পে পিতিত্তো-র নেতৃত্বে পুলিশ ঘাতক শাহাদাতকে হন্যে হয়ে খুঁজছে।

এই জানাজা অনুষ্ঠানে ইতালীয় প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। রোম সিটি কর্পোরেশনের (Campidoglio) প্রতিনিধি হিসেবে ১৩ নম্বর মিউনিসিপ্যালিটির পরিবেশ বিষয়ক অ্যাসেসর সিনজিয়া জারদিনি উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিলর কার্লো মাতিয়া, বাংলাদেশি দূতাবাসের প্রতিনিধি এবং ‘সান্তা রিতা’ গির্জার যাজক ডন লুলাশ ব্রাকাই উপস্থিত থেকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সংহতির অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
কাউন্সিলর কার্লো মাতিয়া তার বক্তব্যে কেবল কামাল উদ্দিনকেই নয়, বরং তার স্ত্রী মমতাজকেও বিশেষভাবে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, “কামাল এই এলাকার প্রতিটি মানুষের কাছে প্রিয় ছিলেন। কিন্তু আমাদের হোসনে জাহানের কথাও মনে রাখতে হবে। তিনি কেবল একজন মা ছিলেন না, বরং এই এলাকার বহু ইতালীয় নারীর একজন প্রকৃত বন্ধু ও আমাদের সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলেন।” উল্লেখ্য, কামাল উদ্দিন দীর্ঘ বছর ধরে স্থানীয় একটি সুপারমার্কেটে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে কাজ করতেন, যার ফলে পুরো এলাকা তাকে এক নামে চিনত এবং শ্রদ্ধা করত।
কাসালোত্তির স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এই হত্যাকাণ্ড কেবল একটি প্রবাসী পরিবারের ওপর নয়, বরং পুরো পাড়ার শান্তি ও সংহতির ওপর আঘাত হেনেছে। জানাজা শেষে মরদেহগুলো বাংলাদেশে তাদের গ্রামের বাড়িতে পাঠানোর জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র তৈরির কাজ চলছে। অন্যদিকে, রোম পুলিশ শাহাদাত হোসেনকে গ্রেপ্তারে তাদের অভিযান আরও জোরদার করেছে। প্রবাসী বাংলাদেশিরা দ্রুততম সময়ের মধ্যে খুনিকে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
রোমের কাসালোত্তিতে নিহত বাংলাদেশি পরিবারের জানাজায় দুই শতাধিক মানুষের শোক প্রকাশ খুনিকে আত্মসমর্পণ করে বিচারের মুখোমুখি হওয়ার আহ্বান ইমামের
roma.repubblica


