ভূমধ্যসাগরে ১১ দিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে ৯ বাংলাদেশির করুণ পরিণতি: নিখোঁজ আরও অনেকে

4 Min Read

লিবিয়া থেকে সমুদ্রপথে গ্রিস যাওয়ার চেষ্টাকালে মাঝ সমুদ্রে ইঞ্জিন বিকল হয়ে এবং খাদ্য ও পানির অভাবে ৯ বাংলাদেশি অভিবাসীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। বেঁচে ফেরা যাত্রীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে সাগরে ১১ দিন ভেসে থাকার সেই নারকীয় অভিজ্ঞতার কথা।

উন্নত জীবনের আশায় ইউরোপ পাড়ি দিতে গিয়ে ভূমধ্যসাগরের নীল জলরাশি আবারও বাংলাদেশিদের রক্তে রঞ্জিত হলো। লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে একটি রাবার বোট মাঝ সমুদ্রে দিকভ্রান্ত হয়ে ১১ দিন ভেসে থাকার পর ৯ জন বাংলাদেশি এবং একজন সুদানি নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। কায়রোস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের এক প্রতিবেদনের বরাতে আজ বুধবার প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।

সাগরে ১১ দিনের নারকীয় অভিজ্ঞতা

বেঁচে ফেরা যাত্রী সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার আব্দুল করিমের বর্ণনা অনুযায়ী, গত ৩ আগস্ট ৩৮ জন বাংলাদেশি ও ৪ জন সুদানি নাগরিকসহ মোট ৪২ জন আরোহী লিবিয়া থেকে গ্রিসের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। মাত্র ২৫ জন ধারণক্ষমতার ওই রাবার বোটে পাচারকারীরা ৪২ জনকে গাদাগাদি করে তুলে দিয়েছিল। বোটে কোনো দিকনির্ণয় যন্ত্র বা নেভিগেশন সিস্টেম ছিল না এবং ছিল মাত্র একটি ইঞ্জিন।

যাত্রার কিছুদূর পরেই মাঝ সমুদ্রে বোটটির ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায় এবং জ্বালানি ফুরিয়ে যায়। এরপর টানা ১১ দিন প্রখর রোদ আর উত্তাল সাগরে ভাসতে থাকেন তারা। করিম জানান, তীব্র দাবদাহ এবং পানীয় জল ও খাবারের অভাবে একে একে ১০ জন যাত্রী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। মৃতদেহগুলো পচে দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করলে এবং পচন ধরলে পাচারকারীদের নির্দেশ মেনে অবশিষ্ট যাত্রীরা বাধ্য হয়ে মরদেহগুলো সাগরে ফেলে দেন। দীর্ঘ সময় লোনা পানিতে ভিজে থাকায় বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের অনেকের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গেও পচন ধরেছে।

উদ্ধার ও চিকিৎসাধীন অবস্থা

অবশেষে ১৩ আগস্ট সন্ধ্যায় নৌকাটি মিশরের মারসা মাতরুহ উপকূলে ভিড়লে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেয়। সেখান থেকে ২৯ জন বাংলাদেশিকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। কায়রোস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম উইংয়ের প্রথম সচিব মো. জাকির হোসেন জানান, উদ্ধারকৃতদের মধ্যে ১৮ জনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাদের মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। দূতাবাস বর্তমানে তাদের কন্সুলার সহায়তা প্রদান করছে এবং পুরো পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে।

পরিসংখ্যানে উদ্বেগজনক চিত্র

আন্তর্জাতিক সীমান্ত সংস্থা ফ্রন্টেক্স (Frontex) এবং ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, লিবিয়া থেকে সমুদ্রপথে গ্রিসে পৌঁছানো অভিবাসীদের তালিকায় এখন শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই ৩ হাজার ৬০৮ জন বাংলাদেশি এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ পাড়ি দিয়েছেন। ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার বাংলাদেশি ‘সেন্ট্রাল মেডিটেরিয়ান রুট’ ব্যবহার করে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করেছেন।

ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরীফুল হাসান এই ক্রমবর্ধমান মৃত্যুর মিছিলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তান বা চরম দারিদ্র্যপীড়িত সুদানকেও পেছনে ফেলে বাংলাদেশিদের এই বিপজ্জনক পথ বেছে নেওয়া দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। লিবিয়ায় বাংলাদেশিরা প্রতিনিয়ত মুক্তিপণ, শারীরিক নির্যাতন ও অমানবিক পরিস্থিতির শিকার হচ্ছে।” তিনি মনে করেন, উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া এই মানবপাচার রোধ করা সম্ভব নয়।

নিখোঁজ ও দালালদের প্রভাব

এদিকে সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ এলাকার অন্তত ৫ জন যুবক এই নৌকাযাত্রায় অংশ নিয়ে নিখোঁজ রয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। নিখোঁজদের স্বজনরা জানান, গত ৩১ জুলাইয়ের পর থেকে তাদের সাথে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন যে, প্রভাবশালী দালালচক্র নিখোঁজদের পরিবারকে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে এবং গণমাধ্যমের সাথে কথা বলতে নিষেধ করছে। দালালরা দাবি করছে যে তাদের সন্তানরা বেঁচে আছে, যাতে পরিবারগুলো আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ না করে।

এই মর্মান্তিক ঘটনাটি আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, অবৈধ অভিবাসনের রঙিন স্বপ্নের আড়ালে ওত পেতে থাকে ভয়াবহ মৃত্যু ও লাঞ্ছনা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে এমন সলিল সমাধি ঠেকানো কঠিন হবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

গ্রিসগামী নৌকায় ১১ দিন ভেসে খাবার-পানির সংকটে ৯ বাংলাদেশি ও ১ সুদানি নিহত; ৪২ যাত্রীর নৌকাটি ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত ছিল এবং ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়েছিল।

thedailystar

Share This Article