গাজায় ‘গণহত্যা’র তীব্র নিন্দা কন্তের: ফিলিস্তিন রাষ্ট্র স্বীকৃতি ও ইতালির ডানপন্থী সরকারের কড়া সমালোচনা

4 Min Read

বেথলেহেমের একটি শরণার্থী শিবিরের সাথে ইতালির রিয়াচে শহরের বিশেষ চুক্তির অনুষ্ঠানে গাজা পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন ইতালির সাবেক প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি, ইউরোপের ক্রমবর্ধমান অস্ত্র প্রতিযোগিতা ও যুদ্ধ-অর্থনীতিরও কড়া সমালোচনা করেন তিনি।

ইতালির সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং রাজনৈতিক দল ‘ফাইভ স্টার মুভমেন্ট’ (M5S)-এর নেতা জুসেপ্পে কন্তে ফিলিস্তিনের গাজায় চলমান ইসরায়েলি হামলাকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। একইসঙ্গে তিনি ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন এবং মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে ইতালির বর্তমান সরকারের নীরবতার কঠোর সমালোচনা করেছেন।

সম্প্রতি ইতালির দক্ষিণাঞ্চলীয় রিয়াচে (Riace) শহর এবং ফিলিস্তিনের বেথলেহেমের দেইশেহ (Deheisheh) শরণার্থী শিবিরের মধ্যে একটি প্রতীকী ভ্রাতৃত্ববোধ বা ‘জেমেল্লাজ্জো’ (Gemellaggio) চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে কন্তে এসব কথা বলেন।

রিয়াচে শহরের মেয়র মিম্মো লুকানো এবং স্থানীয় গির্জার বিশপসহ অন্যান্য ধর্মীয় নেতাদের এই সাহসী উদ্যোগের জন্য ধন্যবাদ জানান কন্তে। তিনি বলেন, মানবমর্যাদা রক্ষার ক্ষেত্রে এই চুক্তি একটি অনন্য প্রতীক। ফিলিস্তিনিরা চরম দারিদ্র্যের মধ্যে থাকলেও তাদের ওপর যে অমানবিক নির্যাতন চলছে, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

গাজা ও পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি তুলে ধরে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, “গাজায় আমরা যা দেখছি তা আক্ষরিক অর্থেই একটি গণহত্যা। বছরের পর বছর ধরে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোতে সহিংস আগ্রাসন চলছে। আন্তর্জাতিক আইন এবং মানুষের ন্যূনতম মৌলিক চাহিদাকে সেখানে চরমভাবে পদদলিত করা হচ্ছে।” লেবানন এবং সিরিয়ায় ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলার কথাও উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক নীতিমালার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

এই অমানবিক পরিস্থিতিতে ইতালির বর্তমান সরকারের অবস্থান নিয়ে কন্তে গভীর হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ইতালি সবসময় মানবাধিকার ও সাংবিধানিক মূল্যবোধের পক্ষে থাকলেও বর্তমান ডানপন্থী সরকার গাজার গণহত্যার বিষয়ে ‘বধির ও অপরাধমূলক নীরবতা’ পালন করছে। এটি ইতালির ঐতিহ্য ও সংবিধানের সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ভবিষ্যতে তার দল পুনরায় ক্ষমতায় গেলে প্রধান পদক্ষেপগুলোর রূপরেখাও তুলে ধরেন কন্তে। তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, “আমাদের প্রথম কাজগুলোর মধ্যে একটি হবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া। এছাড়া নেতানিয়াহু সরকারের সাথে ইতালির সমস্ত সম্পর্ক, বিশেষ করে সামরিক সহযোগিতা চুক্তি বাতিল করা হবে।” ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে ইসরায়েলের ‘বিশেষ অংশীদারিত্ব’ চুক্তি বাতিলের জন্য তার দল ইউরোপীয় পার্লামেন্টে লড়াই করবে বলেও তিনি ঘোষণা দেন। পাশাপাশি, এই গণহত্যার সাথে জড়িত ইসরায়েলি নেতাদের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবি জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য পাসকোয়ালে ত্রিদিকোও উপস্থিত ছিলেন। তাকে পাশে রেখে কন্তে ইউরোপের বর্তমান ‘যুদ্ধ-অর্থনীতি’ এবং ক্রমবর্ধমান অস্ত্র প্রতিযোগিতার কড়া সমালোচনা করেন। জার্মান গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ভক্সওয়াগেনের (Volkswagen) বর্তমান সংকটের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, শিল্প সংকট মোকাবিলায় ইউরোপের কারখানাগুলোকে এখন গাড়ি তৈরির বদলে মিসাইল ও ট্যাংক তৈরির কারখানায় রূপান্তরিত করার পরিকল্পনা চলছে, যা অত্যন্ত ভীতিকর।

ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রেসিডেন্ট রবের্তা মেতসোলার সমালোচনা করে কন্তে জানান, তার দল ইউরোপীয় শিল্পের পুনরুদ্ধারের জন্য একটি বাস্তবসম্মত বিনিয়োগ পরিকল্পনার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু ইউরোপীয় নেতারা সেই প্রস্তাব উপেক্ষা করে সচেতনভাবে ইউরোপকে একটি ‘যুদ্ধ-অর্থনীতির’ দিকে ঠেলে দিচ্ছেন।

পরিশেষে, অবিলম্বে এই উন্মাদনামূলক অস্ত্র প্রতিযোগিতা বন্ধ করার আহ্বান জানান জুসেপ্পে কন্তে। তিনি বলেন, প্রকৃত নিরাপত্তা কেবল আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, কূটনীতি এবং সংলাপের মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব, অন্ধের মতো সামরিক খাতে অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমে নয়।

রিয়াচে–বেথলেহেমের প্রস্তাবিত সম্প্রীতি জোটকে তিনি মানবিক মর্যাদা ও সংহতির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা এবং ইউরোপের অস্ত্র প্রতিযোগিতা বন্ধের আহ্বান জানান।

lacnews24

Share This Article