ইতালিতে দূরবর্তী কর্মপরিবেশ বা স্মার্ট ওয়ার্কিংয়ের ক্ষেত্রে কর্মীদের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় নতুন এবং কঠোর আইনি বিধান কার্যকর করা হয়েছে। এখন থেকে কোনো প্রতিষ্ঠান যদি তাদের কর্মীদের কাজের ঝুঁকি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দিতে ব্যর্থ হয়, তবে মালিকপক্ষকে জেল হাজতসহ মোটা অংকের প্রশাসনিক জরিমানার মুখোমুখি হতে হবে।
ইতালির শ্রমবাজারের আধুনিকায়নের সাথে সাথে কর্মীদের শারীরিক ও মানসিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। নতুন এই নিয়ম অনুযায়ী, যেসব কর্মী অফিসের বাইরে বা বাড়ি থেকে কাজ (Smart Working) করছেন, তাদের কাজের পরিবেশ কতটা নিরাপদ সে বিষয়ে কোম্পানিকে নিয়মিত তদারকি করতে হবে। বিশেষ করে, দীর্ঘ সময় কম্পিউটারের সামনে কাজ করার ফলে চোখের ক্ষতি প্রতিরোধ, সঠিক বসার ভঙ্গি বা এরগনোমিক (Ergonomic) চেয়ারের ব্যবহার এবং কাজের ফাঁকে বিরতি নেওয়ার গুরুত্ব সম্পর্কে কর্মীদের সচেতন করা এখন থেকে মালিকের আইনি দায়িত্ব।
কঠোর শাস্তির বিধান
নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে বছরে অন্তত একবার তাদের স্মার্ট ওয়ার্কিং কর্মীদের জন্য একটি লিখিত নির্দেশিকা বা তথ্যপত্র (Informativa scritta) সরবরাহ করতে হবে। এই দলিলে কর্মকালীন স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং তা থেকে বাঁচার উপায়গুলো বিস্তারিতভাবে উল্লেখ থাকা বাধ্যতামূলক। যদি কোনো কোম্পানি এই তথ্য প্রদানে অবহেলা করে, তবে তাকে সর্বোচ্চ ৭ হাজার ৪০০ ইউরো পর্যন্ত জরিমানা করা হতে পারে। অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দুই থেকে চার মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড দেওয়ার বিধানও রাখা হয়েছে। ইতিপূর্বে এই বিষয়ে সাধারণ বাধ্যবাধকতা থাকলেও, বর্তমান সংশোধনীতে আর্থিক ও প্রশাসনিক শাস্তিকে আরও সুনির্দিষ্ট ও কঠোর করা হয়েছে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি ও সচেতনতা
ডিজিটাল স্ক্রিন বা ভিডিও টার্মিনালের সামনে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার ফলে সৃষ্ট চোখের ক্লান্তি এবং মানসিক চাপ বা ‘স্ট্রেস’ কমানোর বিষয়টিতে নতুন আইনে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। এছাড়া কর্মীকে শেখাতে হবে কীভাবে কিবোর্ড, স্ক্রিন এবং মাউস সঠিকভাবে স্থাপন করতে হয়, যাতে দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক জটিলতা এড়ানো যায়। মূলত কর্মীরা যেন অফিসের বাইরের কর্মপরিবেশেও দাপ্তরিক মানদণ্ড অনুযায়ী সুরক্ষা পান, সেটিই এই আইনের মূল লক্ষ্য।
স্মার্ট ওয়ার্কিংয়ের প্রসার ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট
সরকারি তথ্যমতে, গত এক বছরে ইতালিতে প্রায় ৩৫ লক্ষ মানুষ স্মার্ট ওয়ার্কিং ব্যবস্থার আওতায় কাজ করেছেন। এদের বড় একটি অংশ বেসরকারি খাতের কর্মী হলেও, বর্তমানে সরকারি খাতের ইউনিয়নগুলোও (Sindacati) এই সুবিধা আরও বাড়ানোর জন্য সরকারের ওপর চাপ দিচ্ছে। এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে কাজ করছে চলমান জ্বালানি সংকট এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি। বাড়ি থেকে কাজ করলে যাতায়াত খরচ এবং বাইরের খাবারের ব্যয় বাবদ একজন কর্মী বছরে কয়েকশ ইউরো সাশ্রয় করতে পারেন, যা বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পেশা পরিবর্তনের অস্থিরতা
আইনি এই কড়াকড়ির মধ্যেই ইতালির কর্মসংস্থান বাজারে এক ভিন্নধর্মী অস্থিরতা লক্ষ্য করা গেছে। সম্প্রতি ‘ইনডিড’ (Indeed) এর জন্য ‘সেনসাসওয়াইড’ পরিচালিত এক জরিপে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। ইতালির প্রায় ১০০০ জন কর্মজীবী ও চাকরিপ্রার্থীর ওপর চালানো ওই জরিপ অনুযায়ী, দেশটির প্রায় ৬৯ শতাংশ কর্মী বর্তমানে তাদের পেশা পরিবর্তন করতে ইচ্ছুক। এমনকি ২৬ শতাংশ পূর্ণকালীন ও খণ্ডকালীন কর্মীর কাছে পেশা পরিবর্তনের বিষয়টি একটি ‘ধ্রুব চিন্তা’ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। তবে এই বিশাল সংখ্যক মানুষ নতুন কোনো পেশায় যেতে চাইলেও, তাদের অধিকাংশই জানে না ঠিক কোথা থেকে বা কীভাবে এই পরিবর্তন শুরু করা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইতালির শ্রমবাজারে একদিকে যেমন প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট ওয়ার্কিংয়ের জন্য নতুন আইনের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে, তেমনি কর্মীদের মধ্যে পেশাগত অসন্তুষ্টি এবং নতুনত্বের সন্ধানে এক ধরনের নীরব পরিবর্তন কাজ করছে। মালিকপক্ষকে এখন কেবল আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, বরং কর্মীদের মানসিক সন্তুষ্টির দিকেও বিশেষ নজর দিতে হবে। ইতালিতে বসবাসরত বিদেশি কর্মী এবং অভিবাসীদের জন্যেও এই আইন সমানভাবে প্রযোজ্য হবে, যা তাদের কর্মক্ষেত্রে আইনি অধিকার রক্ষায় সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
ইতালিতে কর্মজীবী ও চাকরিপ্রার্থীদের ৬৯ শতাংশ পেশা পরিবর্তনের কথা ভাবছেন, তবে জরিপে বড় অংশই জানেন না কোথা থেকে শুরু করবেন—দেশটির শ্রমবাজারে পরিবর্তনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট।
tg24.sky


