গ্রিসের ক্রিট উপকূলে ৪ কিশোরকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে; এদিকে অনিয়মিত অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে গ্রিস সরকার, যার অংশ হিসেবে আশ্রয় আবেদন প্রক্রিয়া উগান্ডার মতো তৃতীয় কোনো দেশে স্থানান্তরের পরিকল্পনা চলছে।
গ্রিসের দক্ষিণ উপকূলীয় দ্বীপ ক্রিটে মানবপাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে চারজন কিশোরকে গ্রেপ্তার করেছে দেশটির কোস্টগার্ড। লিবিয়া থেকে ছোট ছোট নৌকায় করে অন্তত ২২৯ জন অভিবাসীকে গ্রিসে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে এসব কিশোর সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে জীবন বিপন্ন করা এবং অবৈধ অনুপ্রবেশে সহায়তার অভিযোগ আনা হয়েছে। গ্রিক কর্তৃপক্ষের এই পদক্ষেপ এমন এক সময়ে এলো, যখন দেশটি তাদের অভিবাসন ও আশ্রয়দান নীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এনে আরও কঠোর আইন প্রণয়ন করতে যাচ্ছে।
গ্রিক কোস্টগার্ডের বরাত দিয়ে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, উত্তর আফ্রিকা থেকে আসা অনিয়মিত অভিবাসীরাই এই চার কিশোরকে শনাক্ত করেছে। লিবিয়াভিত্তিক পাচারকারী চক্রের হয়ে তারা নৌকাগুলো চালাচ্ছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। গত ১৪ আগস্ট মাত্র ৩৬ ঘণ্টার ব্যবধানে চারটি নৌকা ক্রিট উপকূলে পৌঁছালে অ্যাথেন্সের পুলিশ তাদের আটক করে। অভিযুক্ত চার কিশোরের বয়স ১৪ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে এবং তারা দক্ষিণ সুদানের নাগরিক বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়াও একই অভিযোগে দক্ষিণ সুদানের আরও দুই যুবককে (২১ ও ২৭ বছর বয়সী) গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যারা আরও ১৩২ জন অভিবাসীকে নিয়ে গ্রিসে পৌঁছেছিল।
টোব্রুক-ক্রিট রুটের ভয়াবহতা ও বাংলাদেশি অভিবাসী
সাম্প্রতিক সময়ে মানবপাচারের জন্য তুরস্কের চেয়ে লিবিয়ার টোব্রুক অঞ্চল থেকে ক্রিট অভিমুখে সমুদ্রপথটি পাচারকারীদের কাছে বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। প্রায় ৩৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রায় এ বছর এখন পর্যন্ত অন্তত ২৫০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। স্থানীয় প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই পথে আসা অভিবাসীদের মধ্যে বিশেষ করে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের তরুণদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে।
২০২৬ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ লিবিয়া থেকে ক্রিট দ্বীপে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে। সরকারি তথ্যমতে, চলতি বছরে গ্রিসে হওয়া মোট অনিয়মিত অনুপ্রবেশের প্রায় ৫০ শতাংশই ঘটেছে এই পথে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাচারকারীদের চটকদার বিজ্ঞাপন এবং সফলভাবে পৌঁছানো অভিবাসীদের খণ্ডিত ভিডিও দেখে অনেক বাংলাদেশি যুবক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই পথে পা বাড়াচ্ছেন। তবে সমুদ্রের মাঝখানের ভয়াবহ বাস্তবতা এবং গ্রিসের বর্তমান কঠোর আইন সম্পর্কে তাদের সঠিক তথ্য দেওয়া হয় না বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিতর্কিত নীতি ও হাফতার ইস্যু
অভিবাসন ঠেকাতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বর্তমানে পূর্ব লিবিয়ার বিদ্রোহী নেতা খলিফা হাফতারের প্রশাসনের সঙ্গে একটি বিতর্কিত সহযোগিতা চুক্তির পরিকল্পনা করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হাফতার অভিবাসন রুটগুলো নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে ইইউ-কে এক ধরণের ব্ল্যাকমেইল করার সুযোগ পাচ্ছেন। যদিও ইইউ হাফতারের শাসনকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি, তবুও অভিবাসীদের ঢল কমাতে তার সাথে হাত মেলানো ছাড়া ব্রাসেলসের সামনে বিকল্প কোনো পথ নেই বলে মনে করছেন জার্মানির কিছু বিশ্লেষক। জার্মান পররাষ্ট্র দপ্তরের একটি অভ্যন্তরীণ নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হাফতারের বাহিনী অভিবাসীদের ব্যবসায়িক মডেল হিসেবে ব্যবহার করছে।
আশ্রয় আবেদন প্রক্রিয়া ‘আউটসোর্সিং’ বা উগান্ডায় স্থানান্তর
গ্রিস সরকার বর্তমানে উগান্ডা সরকারের সঙ্গে একটি বিশেষ চুক্তির চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এই প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, গ্রিসে আসা অভিবাসীদের সরাসরি উগান্ডায় পাঠিয়ে দেওয়া হবে এবং সেখানেই তাদের আশ্রয়ের আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। যদি তারা শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি পায়, তবে তারা গ্রিসে নয় বরং উগান্ডাতেই থেকে যাবে। ক্ষমতাসীন নিউ ডেমোক্রেসি পার্টির মুখপাত্র দিমিত্রিস কাইরিডিস স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, সরকারের বর্তমান লক্ষ্য হলো ‘ফেরত, ফেরত এবং ফেরত’।
জার্মানি, অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক এবং নেদারল্যান্ডসও গ্রিসের এই উগান্ডা মডেলে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। যদি এই চুক্তি সফল হয়, তবে ২০২৭ সাল থেকে গ্রিসে আসা অনিয়মিত অভিবাসীদের সরাসরি পূর্ব আফ্রিকায় পাঠিয়ে দেওয়া শুরু হতে পারে।
মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগ
গ্রিসের এই কঠোর নীতির তীব্র সমালোচনা করছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা। গ্রিক কাউন্সিল ফর রিফিউজিস-এর স্পাইরোস ওইকোনোমু বলেন, “সীমান্তে মানুষ মারধর করা, তাদের মালামাল কেড়ে নেওয়া এবং অবৈধভাবে অন্য দেশে পুশব্যাক করা কোনো মানবিক নীতি হতে পারে না।” তিনি আরও বলেন, এই ধরনের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতা ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।
ক্রিটে গ্রেপ্তার হওয়া কিশোরদের ক্ষেত্রে গ্রিক আইন কতটা কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে অনিয়মিত অভিবাসন বিরোধী আইনের আওতায় তাদের দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ড হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা বাংলাদেশি বা অন্যান্য দেশের তরুণ অভিবাসীদের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করছে।
চার কিশোরকে ২২৯ অভিবাসী বহনকারী নৌকা চালানোর অভিযোগে ক্রিটে গ্রেপ্তার করা হয়েছে—লিবিয়া থেকে বিপজ্জনক তুবরুক–ক্রিট রুট ও গ্রিসের কঠোরতর অভিবাসন নীতির চিত্র স্পষ্ট হয়েছে।
infomigrants


